০১:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সিন্ধু পানি চুক্তি: ছয় দশক পর বদলে যাওয়া বাস্তবতায় নতুন হিসাবের সময় ভাঁজযোগ্য আইফোনের উৎপাদন দিনে মাত্র কয়েকশ, বাজারে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা ট্রাম্পের নতুন দাবি: ইউক্রেনকে দেওয়া শত শত বিলিয়ন ডলার ইউরোপের কাছ থেকে ফেরত চান রাশিয়ার নাশকতায় ইউরোপে বাড়ছে সংঘাতের ঝুঁকি, চাপে ন্যাটো ছয় মাসের যুদ্ধে আরও আত্মবিশ্বাসী ইরান, বাড়তে পারে সংঘাত পেন্টাগনে ফাঁস ঠেকাতে ৫০ কর্মকর্তার পলিগ্রাফ পরীক্ষা, ইরান যুদ্ধের তথ্য ঘিরে নজিরবিহীন তদন্ত যে ‘ইয়েনটাউন’ একদিন ছিল ভবিষ্যৎ, ৩০ বছর পর ৪কে-তে ফিরছে ‘Swallowtail Butterfly’ পাকিস্তানে বিদ্যুতের দাম বাড়ল ইউনিটে ২.৫৮ রুপি, গ্রাহকের ওপর বাড়তি চাপ ৪৫.৬৭ বিলিয়ন রুপি পরমাণু ‘লিজ’ ছড়িয়ে পড়ছে, বদলে যেতে পারে বৈশ্বিক নিরাপত্তার চিত্র ট্রাম্প কাতারের উপহারের বিলাসবহুল বিমানে যাচ্ছেন আয়ারল্যান্ড

কানাডার ‘চীন কার্ড’: কৌশল, সংকট নাকি বাধ্যতার নতুন ভূরাজনীতি?

বিশ্ব রাজনীতিতে মাঝারি শক্তিধর দেশগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতর নিজেদের অবস্থান কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। বহু বছর ধরে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে পরিচিত কানাডাও এখন সেই কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অটোয়া যেভাবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে, তা বাইরে থেকে দেখলে অনেকের কাছে নীতিগত পরিবর্তন বা চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা সম্ভবত আরও জটিল।

কানাডার এই নতুন কূটনৈতিক অবস্থানকে সরলভাবে ‘চীনমুখী’ বলা ভুল হবে। বরং এটি এমন এক বাস্তববাদী কৌশল, যেখানে অটোয়া একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলাতে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমাতে বিকল্প সম্পর্কের পথ খুঁজছে। মূলত এটি আদর্শগত পুনর্বিন্যাস নয়; বরং অনিশ্চিত বিশ্ব ব্যবস্থায় টিকে থাকার এক ধরনের হিসাবি ভারসাম্যনীতি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। কানাডার অর্থনীতি এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। রপ্তানি, আমদানি, বিনিয়োগ, উৎপাদন—সবখানেই ওয়াশিংটনের প্রভাব নির্ধারক। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক ভাষা কানাডার অভিজাত নীতিনির্ধারকদের মনে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়, কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে অস্বাভাবিক উত্তেজনা তৈরি করে।

বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভারত সফরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী | দৈনিক নয়া দিগন্ত

এই পরিস্থিতিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এমন এক অবস্থান নিয়েছেন, যেখানে তিনি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতে চান না, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকেও ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলানো তার কাছে কেবল কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়; বরং একটি কৌশলগত নিরাপত্তা বেষ্টনী।

আসলে কানাডা-চীন সম্পর্কের বর্তমান উষ্ণতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০১৮ সালে হুয়াওয়ের কর্মকর্তা মেং ওয়ানঝৌকে কানাডায় গ্রেপ্তারের পর দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য বাধা এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ককে বিষাক্ত করে রাখে। সেই পটভূমিতে কার্নির বেইজিং সফর ছিল এক ধরনের পুনঃসূচনা।

তবে এই পুনঃসূচনা সীমাহীন নয়। কানাডা খুব সচেতনভাবে সম্পর্কের ক্ষেত্র বেছে নিচ্ছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা বা টেলিযোগাযোগের মতো স্পর্শকাতর খাতে আগের কঠোর অবস্থান বহাল রয়েছে। হুয়াওয়ে নিষেধাজ্ঞা কিংবা সরকারি যন্ত্রে উইচ্যাট ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হয়নি। অর্থাৎ অটোয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে, কিন্তু নিরাপত্তা কাঠামোতে বেইজিংকে ঢুকতে দিচ্ছে না।

এখানেই কানাডার কৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ। তারা বুঝেছে, চীনের সঙ্গে সীমিত সম্পর্ক পুনর্গঠন মানেই পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়া নয়। বরং নিয়ন্ত্রিত সম্পৃক্ততা অনেক ক্ষেত্রে কৌশলগত দরকষাকষির শক্তি বাড়াতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও কৃষিপণ্যের বিরোধের সাম্প্রতিক সমাধান উল্লেখ করা যায়। দুই পক্ষই এমন সমঝোতায় গেছে, যেখানে সংঘাত কমেছে, কিন্তু কেউই নিজেদের পুরো অবস্থান ছাড়েনি।

Canada's China gambit: Navigating a new triangle - The Business Times

তবু এই নীতির ভেতরে বড় ধরনের ঝুঁকিও আছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও কানাডার প্রধান অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদার। ফলে চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত ওয়াশিংটনের কাছে সন্দেহের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন যখন বাণিজ্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, তখন বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই কানাডা এখন ‘মধ্যশক্তির কূটনীতি’ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছে। শুধু চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নয়, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও তারা সম্পর্ক বিস্তারে জোর দিচ্ছে। এর মাধ্যমে অটোয়া বোঝাতে চাইছে যে তারা কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বহুমুখী অংশীদারিত্বই তাদের ভবিষ্যৎ কৌশল।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভারসাম্য কতদিন ধরে রাখা সম্ভব? কারণ ভূরাজনীতি কখনও স্থির থাকে না। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা যত তীব্র হবে, মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা দেশগুলোর জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া তত কঠিন হয়ে উঠবে। বিশেষ করে কানাডার মতো দেশ, যার নিরাপত্তা কাঠামো পশ্চিমা জোটের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, তাদের জন্য ‘দুই দিকেই সম্পর্ক’ নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

কানাডায় পিআর পাওয়ার জনপ্রিয় উপায় স্টার্টআপ ভিসা

আরেকটি বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। চীনের বাজার কানাডার জন্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে কৃষিপণ্যে। অতীতে বেইজিং যেভাবে বাণিজ্যকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, তা কানাডার নীতিনির্ধারকদের নিশ্চয়ই মনে আছে। ফলে সম্পর্ক উন্নয়নের মধ্যেও অবিশ্বাস রয়ে গেছে।

তাই কানাডার বর্তমান কৌশলকে সরল কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক অর্থনৈতিক কৌশল, যেখানে দেশটি বৈশ্বিক শক্তির সংঘর্ষের মধ্যে নিজেদের জন্য কিছু বাড়তি জায়গা তৈরি করতে চাইছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেও কীভাবে বিকল্প দরজা খোলা রাখা যায়—অটোয়ার নীতি এখন সেই পরীক্ষার মধ্যেই রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত কানাডার অভিজ্ঞতা হয়তো আরও বড় একটি বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অনেক মিত্র রাষ্ট্রও আর একক শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে স্বস্তি বোধ করছে না। নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতির নতুন সমীকরণ দেশগুলোকে বাধ্য করছে আরও নমনীয়, কখনও কখনও পরস্পরবিরোধী পথ বেছে নিতে। কানাডার ‘চীন কার্ড’ সেই পরিবর্তিত সময়েরই প্রতিচ্ছবি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সিন্ধু পানি চুক্তি: ছয় দশক পর বদলে যাওয়া বাস্তবতায় নতুন হিসাবের সময়

কানাডার ‘চীন কার্ড’: কৌশল, সংকট নাকি বাধ্যতার নতুন ভূরাজনীতি?

১২:৫৬:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতিতে মাঝারি শক্তিধর দেশগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতর নিজেদের অবস্থান কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। বহু বছর ধরে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে পরিচিত কানাডাও এখন সেই কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অটোয়া যেভাবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে, তা বাইরে থেকে দেখলে অনেকের কাছে নীতিগত পরিবর্তন বা চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা সম্ভবত আরও জটিল।

কানাডার এই নতুন কূটনৈতিক অবস্থানকে সরলভাবে ‘চীনমুখী’ বলা ভুল হবে। বরং এটি এমন এক বাস্তববাদী কৌশল, যেখানে অটোয়া একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলাতে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমাতে বিকল্প সম্পর্কের পথ খুঁজছে। মূলত এটি আদর্শগত পুনর্বিন্যাস নয়; বরং অনিশ্চিত বিশ্ব ব্যবস্থায় টিকে থাকার এক ধরনের হিসাবি ভারসাম্যনীতি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। কানাডার অর্থনীতি এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। রপ্তানি, আমদানি, বিনিয়োগ, উৎপাদন—সবখানেই ওয়াশিংটনের প্রভাব নির্ধারক। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক ভাষা কানাডার অভিজাত নীতিনির্ধারকদের মনে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়, কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে অস্বাভাবিক উত্তেজনা তৈরি করে।

বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভারত সফরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী | দৈনিক নয়া দিগন্ত

এই পরিস্থিতিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এমন এক অবস্থান নিয়েছেন, যেখানে তিনি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতে চান না, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকেও ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলানো তার কাছে কেবল কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়; বরং একটি কৌশলগত নিরাপত্তা বেষ্টনী।

আসলে কানাডা-চীন সম্পর্কের বর্তমান উষ্ণতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০১৮ সালে হুয়াওয়ের কর্মকর্তা মেং ওয়ানঝৌকে কানাডায় গ্রেপ্তারের পর দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য বাধা এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ককে বিষাক্ত করে রাখে। সেই পটভূমিতে কার্নির বেইজিং সফর ছিল এক ধরনের পুনঃসূচনা।

তবে এই পুনঃসূচনা সীমাহীন নয়। কানাডা খুব সচেতনভাবে সম্পর্কের ক্ষেত্র বেছে নিচ্ছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা বা টেলিযোগাযোগের মতো স্পর্শকাতর খাতে আগের কঠোর অবস্থান বহাল রয়েছে। হুয়াওয়ে নিষেধাজ্ঞা কিংবা সরকারি যন্ত্রে উইচ্যাট ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হয়নি। অর্থাৎ অটোয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে, কিন্তু নিরাপত্তা কাঠামোতে বেইজিংকে ঢুকতে দিচ্ছে না।

এখানেই কানাডার কৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ। তারা বুঝেছে, চীনের সঙ্গে সীমিত সম্পর্ক পুনর্গঠন মানেই পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়া নয়। বরং নিয়ন্ত্রিত সম্পৃক্ততা অনেক ক্ষেত্রে কৌশলগত দরকষাকষির শক্তি বাড়াতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও কৃষিপণ্যের বিরোধের সাম্প্রতিক সমাধান উল্লেখ করা যায়। দুই পক্ষই এমন সমঝোতায় গেছে, যেখানে সংঘাত কমেছে, কিন্তু কেউই নিজেদের পুরো অবস্থান ছাড়েনি।

Canada's China gambit: Navigating a new triangle - The Business Times

তবু এই নীতির ভেতরে বড় ধরনের ঝুঁকিও আছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও কানাডার প্রধান অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদার। ফলে চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত ওয়াশিংটনের কাছে সন্দেহের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন যখন বাণিজ্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, তখন বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই কানাডা এখন ‘মধ্যশক্তির কূটনীতি’ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছে। শুধু চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নয়, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও তারা সম্পর্ক বিস্তারে জোর দিচ্ছে। এর মাধ্যমে অটোয়া বোঝাতে চাইছে যে তারা কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বহুমুখী অংশীদারিত্বই তাদের ভবিষ্যৎ কৌশল।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভারসাম্য কতদিন ধরে রাখা সম্ভব? কারণ ভূরাজনীতি কখনও স্থির থাকে না। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা যত তীব্র হবে, মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা দেশগুলোর জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া তত কঠিন হয়ে উঠবে। বিশেষ করে কানাডার মতো দেশ, যার নিরাপত্তা কাঠামো পশ্চিমা জোটের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, তাদের জন্য ‘দুই দিকেই সম্পর্ক’ নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

কানাডায় পিআর পাওয়ার জনপ্রিয় উপায় স্টার্টআপ ভিসা

আরেকটি বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। চীনের বাজার কানাডার জন্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে কৃষিপণ্যে। অতীতে বেইজিং যেভাবে বাণিজ্যকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, তা কানাডার নীতিনির্ধারকদের নিশ্চয়ই মনে আছে। ফলে সম্পর্ক উন্নয়নের মধ্যেও অবিশ্বাস রয়ে গেছে।

তাই কানাডার বর্তমান কৌশলকে সরল কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক অর্থনৈতিক কৌশল, যেখানে দেশটি বৈশ্বিক শক্তির সংঘর্ষের মধ্যে নিজেদের জন্য কিছু বাড়তি জায়গা তৈরি করতে চাইছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেও কীভাবে বিকল্প দরজা খোলা রাখা যায়—অটোয়ার নীতি এখন সেই পরীক্ষার মধ্যেই রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত কানাডার অভিজ্ঞতা হয়তো আরও বড় একটি বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অনেক মিত্র রাষ্ট্রও আর একক শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে স্বস্তি বোধ করছে না। নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতির নতুন সমীকরণ দেশগুলোকে বাধ্য করছে আরও নমনীয়, কখনও কখনও পরস্পরবিরোধী পথ বেছে নিতে। কানাডার ‘চীন কার্ড’ সেই পরিবর্তিত সময়েরই প্রতিচ্ছবি।