রমজান এলেই ইফতারের টেবিল বদলে যাচ্ছে। ঘরের ডাইনিং টেবিল নয়, এবার ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে পাহাড়ের পথে হাঁটছেন অনেকে। সূর্যাস্তের ঠিক আগে ট্রেইলের শুরুতে জড়ো হন হাইকাররা। আজানের সময় তারা থাকেন পাহাড়ের গভীরে। খেজুর, পানি আর ভাগাভাগি করা সহজ খাবারেই খুলে দেন রোজা।
এই সরল মুহূর্তেই তারা খুঁজে পান রমজানের আসল সৌন্দর্য—সংযম, উদারতা আর একাত্মতার অনুভূতি। দৈনন্দিন জীবনের কোলাহল থেকে দূরে, প্রকৃতির নীরবতার মধ্যে ইফতার যেন এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে।
রমজানে কেন জনপ্রিয় হচ্ছে পাহাড়ে ইফতার
সংযুক্ত আরব আমিরাতে সংগঠিত হাইকিং দলগুলোর কাছে রমজান এখন বছরের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ সময়। রোজা থাকা সত্ত্বেও নয়, বরং রোজার কারণেই অনেকে প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাতে আগ্রহী হচ্ছেন।
আমিরাত অ্যাডভেঞ্চারস টিমের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আল কাবি জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছর ধরে তারা আনুষ্ঠানিক ইফতার হাইক আয়োজন করছেন। বন্ধুবান্ধবের ছোট উদ্যোগ থেকে এটি এখন নিরাপত্তা ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে সাজানো নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে।
তিনি জানান, সবার রোজার অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। তাই বিভিন্ন সময় ও ধরণের আয়োজন রাখা হয়। কোনো কোনো দলে ইফতারের পর সবাই মিলে জামাতে নামাজ আদায় করে রাত নয়টার দিকে হাইক শুরু করেন। একজন ইমামের দায়িত্ব পালন করেন, যাতে রমজানের ধর্মীয় আবহ অক্ষুণ্ণ থাকে।
আবার কেউ বিকেলে হালকা ট্রেইল ধরে পাহাড়ে ওঠেন, চূড়ায় সহজ খাবার দিয়ে রোজা ভেঙে পরে নিচে নেমে পূর্ণাঙ্গ ইফতার করেন। কেউ মাগরিবের আগে হাঁটা শেষ করে কাছের রেস্তোরাঁয় যান, আবার কেউ সেহরির আগে চূড়ায় বসেই খাওয়া সেরে ফেরেন।
তারাবির পর রাত দশটার দিকে ট্রেইলগুলো সবচেয়ে জমজমাট হয়ে ওঠে। তখন অনেকের শক্তি বেশি থাকে এবং নিরাপদে হাঁটাও সহজ হয়।

সবার জন্য সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আয়োজন
আউটডোরজি অ্যাডভেঞ্চারস নামের আরেকটি দল রমজানকে ঘিরে বিশেষ দুই ধরনের অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠাতা আলা মাসুদ জানান, তাদের লক্ষ্য এমন জায়গা বেছে নেওয়া যেখানে সূর্যাস্ত দেখা যায় এবং আজানের ধ্বনি শোনা যায়।
অনেক সময় তারা ম্লেইহার ফসিল রক এলাকাকে বেছে নেন, কারণ সেখানে চারপাশের বিস্তৃত দৃশ্য উপভোগ করা যায়। অংশগ্রহণকারীরা পানি, খেজুর ও হালকা খাবার দিয়ে রোজা ভাঙেন। এরপর নিচে নেমে কাছাকাছি রেস্তোরাঁয় পূর্ণাঙ্গ ইফতার করেন।
যারা রোজা রাখেননি, তারাও অংশ নেন। তবে তারা রোজাদারদের সামনে পানি না খাওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখেন। নিরাপত্তার জন্য সাধারণত পঁচিশ থেকে ত্রিশ জনের বেশি নেওয়া হয় না, কারণ অনেক সময় অন্ধকারে নামতে হয়।
মরুভূমিতেও আয়োজন করা হয় ভাগাভাগির ইফতার, যেখানে সবাই নিজ নিজ খাবার নিয়ে এসে একসঙ্গে বসেন। এতে বিভিন্ন আমিরাত থেকে মানুষ একত্রিত হন।
নীরবতার মধ্যে সংযোগের খোঁজ
গ্রাস্প দ্য অ্যাডভেঞ্চারের প্রতিষ্ঠাতা ইউসুফ এলাব্বাসি জানান, দুই হাজার তেইশ সালে শীতের মনোরম মৌসুমের সঙ্গে রমজান মিলে যাওয়ার পর থেকেই তারা ইফতার হাইক শুরু করেন।
তার মতে, পাহাড়ে হাঁটা মানুষকে ব্যস্ত জীবন, শব্দদূষণ, কর্মচাপ আর সামাজিক চাপ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ইফতারের প্রায় এক ঘণ্টা আগে হাইক শুরু হয়। পরিচয়পর্ব ও নিরাপত্তা নির্দেশনার পর সবাই যাত্রা করেন। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে দল থামে—কখনো পাহাড়ি উপত্যকায়, কখনো খোলা প্রান্তরে।
একজন আরেকজনকে খেজুর বাড়িয়ে দেন, কেউ বাদামের প্যাকেট এগিয়ে দেন, কেউ নিজের স্যান্ডউইচ ভাগ করে নেন। নামাজ শেষে আবার শুরু হয় হাঁটা। রাতের শেষে অনেক সময় পাহাড়েই সেহরির বারবিকিউ আয়োজন করা হয়।
অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা রমজানে কিছুটা কম হলেও যারা আসেন, তারা শুধু শরীরচর্চার জন্য নয়, গভীর মানসিক টানের কারণেই আসেন। শহরের আলো, মোবাইল ফোন আর রেস্তোরাঁর ভিড় থেকে দূরে এই ইফতার যেন এক বিরল বিরতি।
অনেকের কাছে এ সরলতাই রমজানের আসল অর্থকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















