যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানুয়ারিতে ইরানের উদ্দেশে নৌবহর পাঠানোর ইঙ্গিত দিয়ে ভেনেজুয়েলায় দ্রুত সামরিক অভিযানের উদাহরণ টেনেছিলেন। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার মতো ঝটিকা অভিযান ইরানে সম্ভব নয়। ইরানের সামরিক শক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে সহজ, স্বল্প ব্যয়ের বা সীমিত ক্ষতির কোনো সামরিক বিকল্প নেই। প্রাণহানির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
![]()
ইরানের পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অন্যতম বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে। ড্রোন, জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্র এবং মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ইরান একাধিক দেশে আঘাত হানতে সক্ষম। এসব ক্ষেপণাস্ত্র এক হাজার দুইশ মাইলেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, যার আওতায় পড়ে পশ্চিম তুরস্ক পর্যন্ত অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশ।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে সামরিক মহড়ায় ইরান সমুদ্রভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার দাবি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কৌশল হলো দ্রুত উত্তেজনা বাড়িয়ে একাধিক অঞ্চলে অস্থিরতা ছড়ানো, যাতে সংঘাতের খরচ ও চাপ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হলে তার প্রতিক্রিয়া তাদের ভূখণ্ডেও পড়তে পারে। ইসরায়েলের বড় শহরগুলোও সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীর ভূমিকা
ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ইয়েমেনে হুতি, লেবাননে হিজবুল্লাহসহ একাধিক গোষ্ঠীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে তথাকথিত প্রতিরোধ অক্ষ। যদিও সাম্প্রতিক সংঘাতে এসব গোষ্ঠী দুর্বল হয়েছে, তবুও তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে।
ইরাকের অন্তত একটি ইরানসমর্থিত গোষ্ঠী ইতোমধ্যে তেহরানের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত ছড়ালে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলেও নতুন করে হামলা শুরু হতে পারে। এতে যুদ্ধের পরিসর ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হবে।

ইরানের ক্ষমতা কাঠামো ও বাস্তবতা
ইরান একটি ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থার দেশ, যেখানে সর্বোচ্চ নেতাই প্রধান ক্ষমতাধর ব্যক্তি। বিপ্লবী গার্ড নামে পরিচিত শক্তিশালী বাহিনী প্রায় দেড় লাখ সদস্য নিয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থা রক্ষা করে। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা এই জটিল ক্ষমতা কাঠামো ভেঙে ফেলা সহজ নয়।
ভেনেজুয়েলায় যেমন দ্রুত অভিযানে প্রেসিডেন্টকে আটক করা সম্ভব হয়েছিল, ইরানে তেমন সরাসরি নেতৃত্ব অপসারণ অনেক বেশি কঠিন। তেহরান উপসাগর থেকে প্রায় চারশ মাইল ভেতরে অবস্থিত, যা সামরিক অভিযানে অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করে।
হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক অর্থনীতি
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান অতীতে এই প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। যদি তা বাস্তবে রূপ নেয়, জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে।
তবে প্রণালি বন্ধ করলে ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে এই পদক্ষেপ ইরানের জন্যও বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে।

সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানে সামরিক হামলা শুরু হলে তা দ্রুত সীমিত রাখা কঠিন হবে। আঞ্চলিক জোট, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব মিলিয়ে এটি বহুস্তরীয় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। নির্বাচনী বছর বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের হিসাব-নিকাশে প্রাণহানি ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকি বড় ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















