আফগানিস্তানের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর আবারও তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে। সীমান্ত জুড়ে অনিশ্চয়তা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং প্রতিশোধের হুমকিতে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে।
বিমান হামলা ও হতাহতের হিসাব নিয়ে বিভ্রান্তি
পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্র দাবি করেছে, হামলায় অন্তত সত্তর জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। তবে জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই হামলায় কমপক্ষে তেরো জন বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। হতাহতের এই ভিন্ন হিসাব পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
গত অক্টোবরের সীমান্ত সংঘর্ষের পর একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল। সেই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েক ডজন সেনা নিহত হয়েছিল। ২০২১ সালে তালেবান কাবুলের ক্ষমতা নেওয়ার পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনা। নতুন এই হামলা সেই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

কেন বাড়ছে আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা
তালেবান ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার সময় পাকিস্তান প্রকাশ্যে তা স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। ইসলামাবাদের অভিযোগ, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও অনেক যোদ্ধা আফগানিস্তানে অবস্থান করছে। পাশাপাশি বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীরাও আফগান ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে।
২০২২ সালের পর থেকে পাকিস্তানে জঙ্গি হামলা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে টিটিপি ও বেলুচ বিদ্রোহীদের তৎপরতা বাড়ায় পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও চাপে পড়েছে। তবে কাবুল বারবার দাবি করেছে, তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।

সর্বশেষ অভিযানের পেছনের কারণ
বিমান হামলার আগের দিন পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্র জানায়, তাদের কাছে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে যে আফগান মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন হচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে অন্তত সাতটি হামলার সঙ্গে আফগানিস্তানের যোগসূত্র রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
গত সপ্তাহে বাজাউর জেলায় এক হামলায় এগারো জন নিরাপত্তা সদস্য ও দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। পাকিস্তানের দাবি, ওই হামলাকারী ছিলেন এক আফগান নাগরিক এবং হামলার দায় স্বীকার করে টিটিপি।

টিটিপি কারা এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান ২০০৭ সালে উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে সক্রিয় কয়েকটি জিহাদি গোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত হয়। বাজার, মসজিদ, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও থানা লক্ষ্য করে একাধিক বড় হামলার সঙ্গে এই সংগঠনের নাম জড়িয়েছে। আফগান সীমান্তঘেঁষা অঞ্চল ছাড়াও তারা পাকিস্তানের ভেতরে গভীর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছিল।
পাকিস্তান নিজ ভূখণ্ডে একাধিক সামরিক অভিযান চালালেও টিটিপিকে পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হয়নি। কয়েক বছর হামলা কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবার তা বেড়েছে।
সামনে কী হতে পারে
বিমান হামলার পর তালেবান নেতৃত্ব সতর্ক করে বলেছে, উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ সীমান্তজুড়ে পাল্টা হামলা বা সীমিত সামরিক পদক্ষেপ হতে পারে। ইতিমধ্যে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে আরও দুটি হামলার খবর মিলেছে।
সামরিক শক্তির দিক থেকে পাকিস্তান অনেক এগিয়ে। তাদের সক্রিয় সেনা সদস্যের সংখ্যা ছয় লক্ষের বেশি, রয়েছে বিপুল সাঁজোয়া যান ও যুদ্ধবিমান। অন্যদিকে তালেবান বাহিনীর জনবল তুলনামূলক কম এবং কার্যকর বিমান শক্তি সীমিত। তবুও সীমান্ত সংঘর্ষ দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় নতুন প্রশ্ন
দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়তে থাকলে বাণিজ্য, সীমান্ত পারাপার এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও ব্যাহত হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















