চার বছর আগে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এখন পঞ্চম বছরে পা দিয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই। দেশজুড়ে নিহত সেনা ও বেসামরিক মানুষের স্মরণে নেমে এসেছে শোকের আবহ, আর কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে পালিত হয়েছে এক মিনিটের নীরবতা।

কিয়েভে নীরবতা, ময়দানে পতাকা নত
রাজধানী কিয়েভে সকাল দশটায় এক মিনিটের নীরবতায় থেমে যায় শহর। ময়দান স্কয়ারে সারি সারি নীল-হলুদ পতাকা আর নিহতদের ছবির সামনে মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল নীরবে। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে প্রার্থনায় অংশ নেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ফার্স্ট লেডি ওলেনা জেলেনস্কা। ইউরোপের একাধিক নেতাও স্মরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
পশ্চিমাঞ্চলের বুচা শহর, যেখানে ২০২২ সালে যুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেখানেও শহীদদের কবরের সামনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় মানুষ। অনেকেই বলছেন, কেউ ভাবেননি এই যুদ্ধ এত দীর্ঘ হবে।

জেলেনস্কির বার্তা: যুদ্ধ আমরা বেছে নিইনি
জেলেনস্কি তার ভাষণে বলেন, ইউক্রেন এই যুদ্ধ বেছে নেয়নি। তারা নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করেছে এবং রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে। তার কথায়, মানচিত্রে নয়, বাস্তবেও ইউক্রেনের অস্তিত্ব অটুট।
যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে অনেকেই ভেবেছিলেন কিয়েভ দ্রুত পতন হবে। কিন্তু চার বছর পরও পূর্বাঞ্চলে রুশ অগ্রযাত্রা পুরোপুরি সফল হয়নি। যদিও রাশিয়া এখন ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে।

রাশিয়ার অবস্থান ও পশ্চিমা সমর্থন নিয়ে বিতর্ক
ক্রেমলিন স্বীকার করেছে যে তাদের লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি এবং আক্রমণ অব্যাহত থাকবে। তারা অভিযোগ করছে, পশ্চিমা সমর্থন এই সংঘাতকে রাশিয়া ও পশ্চিমের মুখোমুখি অবস্থানে রূপ দিয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় নেতারা বলছেন, শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি ধীর। রাশিয়ার পক্ষ থেকে টেকসই শান্তির ইচ্ছা নেই বলেও মন্তব্য এসেছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে কয়েকটি দেশ সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে ভবিষ্যতে সৈন্য মোতায়েনের কথাও ভাবছে।
শান্তি আলোচনা অনিশ্চিত
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একাধিক দফা আলোচনা হলেও বড় কোনো অগ্রগতি নেই। রাশিয়ার দাবি, পূর্বাঞ্চলের কিছু ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে—যা বহু ইউক্রেনীয়ের কাছে অগ্রহণযোগ্য। কিয়েভ মনে করে, কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো চুক্তি টেকসই হবে না।
জেলেনস্কি বলেছেন, যারা দূর থেকে এই যুদ্ধ দেখছেন, তাদের কিয়েভে এসে বাস্তবতা দেখা উচিত। তবেই বোঝা যাবে এই যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য কতটা।

বাড়ছে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি
যুদ্ধের মানবিক মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। ইউক্রেনের হিসাবে হাজার হাজার সেনা নিহত হয়েছে, যদিও বিভিন্ন সূত্রে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাশিয়ার পক্ষেও বিপুল প্রাণহানি হয়েছে বলে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের দাবি।
শীতের মধ্যে অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ও শহরগুলো চাপে রয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তা জরুরি বলে কিয়েভ জানিয়েছে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
চার বছর পেরিয়ে পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেও যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা স্পষ্ট নয়। একদিকে শোক ও ক্ষতি, অন্যদিকে স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার—এই দুই বাস্তবতার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে ইউক্রেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















