যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে কংগ্রেসে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর এত বড় পরিসরে এই ভাষণকে ঘিরে প্রত্যাশা যেমন তুঙ্গে, তেমনি বাড়ছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও। কারণ, আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটিই কোটি আমেরিকানের সামনে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যার সবচেয়ে বড় সুযোগ।
বদলে যাওয়া আমেরিকা, চাপে প্রেসিডেন্ট
গত এক বছরে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার পরিধি দ্রুত বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। অবৈধ অভিবাসন দমনে কঠোর অভিযান, সীমান্ত কার্যত বন্ধ ঘোষণা, বৈদেশিক জোটে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং নির্বাহী ক্ষমতার বিস্তার—সব মিলিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোয় দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছেন।
তবে এসব পদক্ষেপের সবই জনপ্রিয় হয়নি। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, তার প্রতি সমর্থন কমেছে। অর্থনীতি ও অভিবাসন—দুই ইস্যুতেই যেগুলোতে আগে তার জনসমর্থন ছিল বেশি, সেখানেও আস্থা নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। ফলে এই ভাষণ তার জন্য সমর্থন পুনরুদ্ধারের বড় পরীক্ষা।

নির্বাচনের আগে শেষ বড় মঞ্চ
আর মাত্র আট মাস পরই মধ্যবর্তী নির্বাচন। কংগ্রেসে রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রাখা না গেলে আইন প্রণয়নে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ পেলে তদন্ত ও রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়বে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
এই বাস্তবতায় মঙ্গলবারের ভাষণ ট্রাম্পের জন্য একমাত্র বড় জাতীয় মঞ্চ, যেখানে তিনি সরাসরি ভোটারদের উদ্দেশে নিজের সাফল্য তুলে ধরতে পারবেন। ইতোমধ্যে তিনি দাবি করেছেন, দেশের অর্থনীতি শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং কর্মচাঞ্চল্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্ক
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ ছিল অভিবাসন দমনে জোরালো অভিযান। বিভিন্ন শহরে ফেডারেল কর্মকর্তাদের মোতায়েন, ব্যাপক আটক কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা—এসব উদ্যোগ তার সমর্থকদের সন্তুষ্ট করলেও সাধারণ ভোটারদের একাংশের কাছে তা অতিরিক্ত কঠোর বলে মনে হয়েছে।
মিনিয়াপোলিসে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে প্রশাসন সেখানে অভিযান কিছুটা শিথিল করার ইঙ্গিত দেয়। কংগ্রেসে অভিবাসন বাস্তবায়নে নতুন আইনি সুরক্ষা না দেওয়া পর্যন্ত অর্থায়ন আটকে দেওয়ার হুমকিও এসেছে বিরোধীদের পক্ষ থেকে। ফলে অচলাবস্থা কাটেনি।
বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা
ট্রাম্পের উচ্চ শুল্কনীতি বড় বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে তার কিছু শুল্ক আরোপকে অবৈধ বলা হয়েছে, যা প্রশাসনের বাণিজ্য নীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যদিও তিনি নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন, তবু বাজারে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
শেয়ারবাজার উচ্চ অবস্থানে থাকলেও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার প্রত্যাশার চেয়ে কম। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ক্রেডিট কার্ড সুদ সীমা নির্ধারণ, আবাসন সরবরাহ বাড়ানো কিংবা শুল্ক ফেরত চেক দেওয়ার মতো প্রস্তাবগুলো বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।

পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন মোড়?
ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিয়েও তিনি অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমাবেশ বাড়ানো হলে তা শুধু পররাষ্ট্রনীতিই নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্বিগুণ জোর নাকি সুর নরম?
বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত জনপ্রিয়তা কমে গেলে প্রেসিডেন্টরা কিছুটা সুর নরম করেন। কিন্তু ট্রাম্প বরাবরই সমালোচনার জবাবে নিজের অবস্থানে আরও জোর দেন। তাই এই ভাষণে তিনি আপসের ইঙ্গিত দেবেন, নাকি আগের অবস্থানেই অনড় থাকবেন—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সব মিলিয়ে, বদলে যাওয়া আমেরিকার সামনে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের এই ভাষণ শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















