ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, টেক্সাসে ফেডারেল অভিবাসন এজেন্টের গুলিতে নিহত রুবেন রে মার্টিনেজের গাড়িতে থাকা একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী জোশুয়া অর্তা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। পরিবারের আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যও হারিয়ে গেল।
ঘটনার পটভূমি ও সরকারি দাবি
গত বছরের মার্চে স্প্রিং ব্রেক উপলক্ষে মার্টিনেজ ও অর্তা টেক্সাসের সাউথ পাদ্রে আইল্যান্ডে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যান। ফেরার পথে তারা একটি ব্যস্ত মোড়ে দুর্ঘটনাজনিত যানজটের মুখে পড়েন, যেখানে স্থানীয় পুলিশ ও ফেডারেল এজেন্টরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ দাবি করে, মার্টিনেজ ইচ্ছাকৃতভাবে এক হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশন বিশেষ এজেন্টকে গাড়িচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই পরিস্থিতিতে আরেকজন এজেন্ট আত্মরক্ষার্থে গুলি চালান, যাতে তিনি নিজে, সহকর্মী এবং সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন।

তবে এই ঘটনার তথ্য জনসমক্ষে আনতে বিভাগটি প্রায় ১১ মাস সময় নিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন অভিযানের সময়ে ফেডারেল কর্মকর্তাদের গুলিতে এটি অন্তত ষষ্ঠ মৃত্যুর ঘটনা বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা: সরকারি বক্তব্যের বিরোধিতা
সেপ্টেম্বরে আইনজীবীদের কাছে দেওয়া খসড়া হলফনামায় অর্তা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তার দাবি, মার্টিনেজ কাউকে গাড়িচাপা দেননি। গাড়িটি খুব ধীরগতিতে ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কোনো সতর্কবার্তা বা নির্দেশ না দিয়েই এক ফেডারেল এজেন্ট প্রায় দুই ফুট দূর থেকে চালকের পাশের জানালা দিয়ে গুলি চালান।
অর্তার ভাষ্যমতে, প্রথমে এক স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা গাড়ির ভেতরে খোলা মদের বোতল দেখতে পান এবং তাদের ঘুরে চলে যেতে বলেন। গাড়ি ঘোরানোর সময় আরেকজন কর্মকর্তা গাড়ির সামনে এসে হুডে আঘাত করেন। এরপর একাধিক কর্মকর্তা গাড়িটি ঘিরে ফেলেন এবং চিৎকার করতে করতে অস্ত্র তাক করেন। কিন্তু তখনও গাড়ি প্রায় থেমে থাকা অবস্থায় ছিল এবং কেউ বিপদে ছিলেন না।
অর্তা বলেন, গুলির খোসা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরে পড়ে, যা থেকে বোঝা যায় এজেন্ট খুব কাছ থেকে গুলি করেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে মার্টিনেজ অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হাতকড়া পরানো হয় এবং চিকিৎসা দেওয়ার আগে অন্তত ১০ মিনিট অপেক্ষা করা হয় বলে অভিযোগ।

মায়ের দাবি ও সম্ভাব্য মামলা
মার্টিনেজের মা রাচেল রেয়েস জানান, তার ছেলেকে তিনবার গুলি করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, টেক্সাস রেঞ্জার্সের একজন তদন্তকারী ঘটনার ভিডিও সংগ্রহ করেছেন, যা সরকারের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পরিবার ইতিমধ্যে বেআইনি মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পরিবারের আইনজীবী অ্যালেক্স স্টাম জানান, অর্তার মৃত্যু তার পরিবার ও বন্ধুদের জন্য মর্মান্তিক। একই সঙ্গে মার্টিনেজের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ব একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শীকে হারাল। তার মতে, অর্তার বক্তব্য স্পষ্টভাবে জানায় যে মার্টিনেজ কাউকে আঘাত করেননি এবং গাড়িটি প্রায় স্থির ছিল।
দুর্ঘটনায় অর্তার মৃত্যু
সান অ্যান্টোনিও পুলিশ জানায়, ২৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি উচ্চগতিতে একটি বাঁকানো হাইওয়ে এক্সিটে ঢুকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিদ্যুতের খুঁটিতে ধাক্কা দেন। গাড়িতে আগুন ধরে গেলে যাত্রীরা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেও চালককে উদ্ধার করা যায়নি। মার্টিনেজের পরিবারের আইনজীবীরা নিশ্চিত করেছেন, নিহত ব্যক্তি জোশুয়া অর্তাই।

তদন্তের অগ্রগতি ও বিতর্ক
টেক্সাস রেঞ্জার্স গত সপ্তাহে জানায়, তারা গুলির ঘটনাটি তদন্ত করছে। তবে অর্তার মৃত্যুর আগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি সংস্থাটি। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ তাদের আগের বক্তব্যেই অটল রয়েছে।
এই ঘটনার সঙ্গে মিনিয়াপোলিসে রেনি গুড নামের এক নারীর গুলিতে মৃত্যুর ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। সেখানেও প্রথমে সরকারি বক্তব্যে তাকে গাড়িচাপা দেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ আনা হলেও পরে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে প্রশ্ন ওঠে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের সাধারণত চলন্ত গাড়ির সামনে না দাঁড়ানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, কারণ এতে প্রাণঘাতী ঝুঁকি থাকে। মার্টিনেজের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না।
আইনজীবীদের দাবি, সব প্রমাণ জনসমক্ষে আনা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনে আসা এখন অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি মৃত্যুর বিচার শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং আইনের স্বচ্ছতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















