যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইকে জানিয়েছেন, কোম্পানির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি সামরিক বাহিনীর জন্য সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত না করলে সরকারি চুক্তি বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, মঙ্গলবারের বৈঠকে এ বার্তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয় এবং শুক্রবার পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
অ্যানথ্রপিক তাদের ‘ক্লড’ নামের চ্যাটবটের জন্য পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর নতুন অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে প্রযুক্তি সরবরাহে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একমাত্র অ্যানথ্রপিক এখনো সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হয়নি। আমোদেই দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, সরকারের নিয়ন্ত্রণহীন এআই ব্যবহার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সশস্ত্র ড্রোন পরিচালনা এবং এআই-নির্ভর গণ নজরদারির বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বৈঠকের সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি এবং পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রতিরক্ষা দপ্তর অ্যানথ্রপিককে সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা বা প্রতিরক্ষা উৎপাদন আইন ব্যবহার করে সামরিক বাহিনীকে কোম্পানির প্রযুক্তি ব্যবহারে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়ার কথাও তুলেছে। যদিও এ বিষয়ে তারা প্রকাশ্যে মন্তব্য করার অনুমতি পাননি।
জাতীয় নিরাপত্তা ও এআই বিতর্ক
এই ঘটনাপ্রবাহ জাতীয় নিরাপত্তায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ, সংবেদনশীল তথ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা সরকারি নজরদারির মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সীমা কোথায় হওয়া উচিত—এ প্রশ্ন এখন আরও তীব্র।
গত মাসে এক প্রবন্ধে আমোদেই লিখেছিলেন, কোটি মানুষের বিলিয়নসংখ্যক কথোপকথন বিশ্লেষণ করতে সক্ষম শক্তিশালী এআই জনমতের প্রবণতা বুঝে নিতে পারে, সম্ভাব্য ভিন্নমত চিহ্নিত করতে পারে এবং তা দমনে ব্যবহার হতে পারে।
তবে বৈঠকের পরিবেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ হলেও দুটি বিষয়ে অ্যানথ্রপিক অনড় ছিল বলে জানা গেছে। প্রথমত, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণ কার্যক্রমে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, মার্কিন নাগরিকদের ওপর অভ্যন্তরীণ নজরদারিতে এআই ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না।
পেন্টাগনের অবস্থান
পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সামরিক অভিযানে এমন সরঞ্জাম প্রয়োজন যা আগেভাগে আরোপিত সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়। তাঁর দাবি, প্রতিরক্ষা দপ্তর কেবল আইনসম্মত নির্দেশই দেয় এবং প্রযুক্তির আইনসম্মত ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সামরিক বাহিনীরই।

গত গ্রীষ্মে পেন্টাগন ঘোষণা করে যে, অ্যানথ্রপিক, গুগল, ওপেনএআই এবং ইলন মাস্কের এক্সএআই—এই চারটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করা হয়েছে। প্রতিটি চুক্তির আর্থিক মূল্য সর্বোচ্চ ২০ কোটি ডলার পর্যন্ত। অ্যানথ্রপিক প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে গোপন সামরিক নেটওয়ার্কে কাজের অনুমোদন পায় এবং অংশীদারদের সঙ্গে কাজ শুরু করে।
পরে জানানো হয়, এক্সএআইয়ের ‘গ্রোক’ চ্যাটবটও গোপন পরিবেশে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও একই পর্যায়ে পৌঁছাতে কাছাকাছি বলে দাবি করা হয়।
হেগসেথ জানুয়ারিতে এক ভাষণে বলেন, তিনি এমন এআই মডেল চান না যা যুদ্ধ পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করে। তাঁর ভাষায়, সামরিক এআই ব্যবস্থা হবে এমন, যা আইনসম্মত প্রয়োগে কোনো মতাদর্শগত সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকবে না। তিনি আরও বলেন, পেন্টাগনের এআই ‘ওয়োক’ হবে না।
এরই মধ্যে গ্রোককে পেন্টাগনের নিরাপদ কিন্তু অগোপন নেটওয়ার্ক ‘জেনএআই.মিল’-এ যুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পরে ওপেনএআইও জানায়, তাদের কাস্টমাইজড চ্যাটজিপিটি একই নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে, যাতে সেনাসদস্যরা অগোপন কাজের জন্য এটি ব্যবহার করতে পারেন।
নিরাপত্তা-সচেতন ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন
অ্যানথ্রপিক নিজেদের তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপত্তা-সচেতন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরে। ২০২১ সালে ওপেনএআই ছেড়ে প্রতিষ্ঠাতারা নতুন এই সংস্থা গড়েন। তারা দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রযুক্তি যাচাইয়ের পক্ষে কথা বলে আসছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক বলেন, প্রতিরক্ষা দপ্তরের নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান আইনসম্মত সব প্রয়োগে প্রযুক্তি ব্যবহারে রাজি হয়েছে। ফলে দরকষাকষিতে অ্যানথ্রপিকের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল হতে পারে এবং এআই গ্রহণে পেন্টাগনের অগ্রযাত্রায় তারা প্রভাব হারাতে পারে।
অ্যানথ্রপিক এর আগেও কড়া এআই সুরক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কে জড়িয়েছে। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শিথিলের প্রস্তাব নিয়ে তারা প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিল। আবার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এআই নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত লবিংয়েও ভিন্ন অবস্থানে ছিল।
কোম্পানির প্রধান নির্বাহী আমোদেই এক প্রবন্ধে সতর্ক করেন, ২০২৬ সালে আমরা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রকৃত ঝুঁকির অনেক কাছাকাছি অবস্থান করছি। তবে তিনি মনে করেন, এসব ঝুঁকি বাস্তবসম্মত ও ব্যবহারিক উপায়ে মোকাবিলা করা সম্ভব।
আইন ও নজরদারির প্রশ্ন
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট এক বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, পেন্টাগনের দ্রুতগতির এআই গ্রহণ কংগ্রেসের আরও কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। বিশেষ করে যদি এআই ব্যবহৃত হয় নাগরিকদের ওপর নজরদারিতে, তবে আইনি কাঠামো প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল রাখতে পারছে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিরক্ষা দপ্তর সীমাহীন ক্ষমতা পাবে।
পুরো ঘটনাটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, সামরিক শক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















