ডেটা সেন্টারের বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ খরচ ও কার্বন নিঃসরণ বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ডিভাইস আর অনলাইন পরিষেবার বিস্ফোরণে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ তথ্য। এই বিপুল ডেটা কোথায় এবং কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সামনে এসেছে এক অভিনব প্রযুক্তি, যার নাম ‘মেমোরি ক্রিস্টাল’। গবেষকদের দাবি, এই কাঁচভিত্তিক সংরক্ষণ পদ্ধতি ডেটা সেন্টারের নির্গমন নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিতে পারে।

রহস্যময় আবিষ্কার থেকে সম্ভাবনার দিগন্ত
১৯৯৯ সালে জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের অপ্টোইলেকট্রনিক্স গবেষণাগারে কাজ করার সময় এক অদ্ভুত আলোক-প্রভাব নজরে পড়ে গবেষকদের। অতিক্ষুদ্র সময়মাত্রার লেজার রশ্মি দিয়ে কাঁচের ভেতরে লেখা তৈরির পরীক্ষায় দেখা যায়, আলো কাঁচের ভেতর অস্বাভাবিকভাবে বিচ্ছুরিত হচ্ছে। পরে জানা যায়, লেজারের ক্ষুদ্র ‘মাইক্রো-বিস্ফোরণ’ কাঁচের ভেতরে ন্যানো-গঠন তৈরি করেছে, যা আলোর গতিপথ বদলে দিচ্ছে।
এই আবিষ্কার থেকেই জন্ম নেয় এমন এক প্রযুক্তির ধারণা, যেখানে কাঁচের ভেতর পাঁচ মাত্রায় তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব। আলোর দিক, তীব্রতা এবং ত্রিমাত্রিক অবস্থান—সব মিলিয়ে তৈরি হয় অত্যন্ত ঘন ডেটা বিন্যাস। গবেষকদের মতে, ছোট একটি কাঁচের পাতেই শত শত টেরাবাইট তথ্য রাখা যেতে পারে এবং তা হাজার বছরের বেশি সময় অক্ষত থাকতে পারে।

ডেটা সেন্টারের বাড়তি চাপ
বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার এখন মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় দেড় শতাংশ খরচ করে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই ব্যবহার দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ব্যবস্থার চাহিদা বেড়েছে, যা বিপুল বিদ্যুৎ খরচ করে এবং প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে।
ডেটার বড় অংশই আসলে ‘কোল্ড ডেটা’—যা তাৎক্ষণিক প্রয়োজন হয় না, কিন্তু সংরক্ষণ করতে হয় দীর্ঘ সময়ের জন্য। বর্তমানে এই ডেটা হার্ডডিস্ক বা চৌম্বক ফিতায় রাখা হয়, যেগুলো চালু রাখতে ও নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে নিয়মিত বিদ্যুৎ লাগে। নির্দিষ্ট সময় পর এগুলো বদলাতেও হয়, ফলে বাড়ে বর্জ্য।
‘মেমোরি ক্রিস্টাল’-এর বিশেষত্ব
নতুন কাঁচভিত্তিক প্রযুক্তিতে তথ্য লেখার সময় শক্তি প্রয়োজন হলেও, একবার লেখা হয়ে গেলে তা সংরক্ষণে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ লাগে না। বিশেষ অপটিক্যাল যন্ত্র দিয়ে তথ্য পড়া যায়, এবং গবেষকদের লক্ষ্য ভবিষ্যতে এই পড়া-লেখার গতি আরও বাড়ানো।
এই প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে ইতিমধ্যে একটি উদ্যোগও শুরু হয়েছে। গবেষকরা আশা করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ডেটা সেন্টারে এটি ব্যবহার করা যাবে। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিদ্যমান অবকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্নে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

ডিএনএ-তেও তথ্য সংরক্ষণের সম্ভাবনা
কাঁচের পাশাপাশি ডিএনএ-তেও তথ্য সংরক্ষণের গবেষণা চলছে। এক গ্রাম ডিএনএ-তে বিপুল পরিমাণ তথ্য হাজার বছরের জন্য রাখা সম্ভব বলে দাবি করা হচ্ছে। ডিএনএ সংরক্ষণে ঠান্ডা রাখার প্রয়োজন কম, ফলে শক্তি সাশ্রয় হয়। তবে লিখন প্রক্রিয়া এখনও ব্যয়বহুল, যা বাণিজ্যিক ব্যবহারে বড় বাধা।

ভবিষ্যতের পথ কোনদিকে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নতুন সংরক্ষণ প্রযুক্তি নয়, সফটওয়্যার ও অ্যালগরিদমেও শক্তি দক্ষতা বাড়াতে হবে। সব কাজেই সর্বোচ্চ ক্ষমতার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার না করে প্রয়োজন অনুযায়ী শক্তি ব্যবহার করলে চাপ কমবে। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি সব তথ্য চিরকাল সংরক্ষণ করতেই চাই?
ডেটা সেন্টারের কার্বন নিঃসরণ কমাতে ‘মেমোরি ক্রিস্টাল’ নতুন আশার আলো দেখালেও, এটি কত দ্রুত মূলধারায় আসবে, তা সময়ই বলবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















