পাকিস্তানে বসবাসরত লাখো বাঙালির মনে আবার জেগেছে স্বদেশে ফেরার স্বপ্ন। দীর্ঘ ১৪ বছর বন্ধ থাকার পর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি উড়ান চালু হওয়ায় পরিবার–পরিজনের সঙ্গে পুনর্মিলনের আশা নতুন করে উজ্জ্বল হয়েছে। ১৯৭১ সালে বিভক্ত হওয়ার পর থেকে যে দূরত্ব ও কূটনৈতিক শীতলতা সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছিল, সাম্প্রতিক পরিবর্তনে সেই পরিস্থিতিতে এসেছে ইতিবাচক সুর।
কারাচিতে আটকে থাকা এক জীবনের গল্প
কারাচির এক ব্যস্ত বাজারে শুকনো মাছ বিক্রি করে জীবিকা চালান ষাটোর্ধ্ব শাহ আলম। প্রায় তিন দশক আগে স্বল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু দুই দেশের বৈরী সম্পর্ক ও আর্থিক সংকটে পড়ে আর ফেরা হয়নি। এরই মধ্যে বাংলাদেশে বাবা–মা ও প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
শাহ আলম জানান, কোরবানির ঈদের পর ছেলেকে নিয়ে দেশে ফিরবেন তিনি। বাংলাদেশে এখনও রয়েছে তার কৃষিজমি ও পারিবারিক বাড়ি। সামান্য আয়ে দিন কাটালেও স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তার চোখে জল, কণ্ঠে দৃঢ়তা—স্বদেশে ফিরবেনই।

ঐতিহাসিক বিভাজন ও তার প্রভাব
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দুই অংশ আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সেই সময় ও তার পরবর্তী অস্থিরতায় বহু বাঙালি পাকিস্তানে থেকে যান। বর্তমানে সেখানে প্রায় দশ লক্ষের বেশি জাতিগত বাঙালির বসবাস রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
তাদের অনেকেই অভিযোগ করেন, নাগরিক স্বীকৃতি, শিক্ষা ও ব্যবসার সুযোগ এবং সম্পত্তি ক্রয়ে তারা নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন। কারাচির মচ্ছর কলোনির মতো এলাকায় বহু বাঙালি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস করলেও অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। ফলে স্বদেশে যাতায়াত কিংবা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরিচয় সংকট ও রাষ্ট্রহীনতার বেদনা
কারখানায় কাজ করা তরুণ হুসাইন আহমেদের মতো অনেকেই বলেন, তারা পাকিস্তানেই জন্মেছেন, কিন্তু নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারেন না। পরিচয়পত্র না থাকায় দেশে–বিদেশে চলাচল সীমিত। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ১৯৭১ সালের আগে পরিবার এখানে ছিল—এটি প্রমাণ করতে না পারায় জটিলতায় পড়ছেন।
অনেকের আত্মীয়স্বজন বাংলাদেশে থাকলেও রাষ্ট্রহীন অবস্থার কারণে তাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়নি। এই দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা তাদের জীবনে এক গভীর বেদনা হয়ে আছে।
সম্পর্ক উষ্ণতায় নতুন সম্ভাবনা
সম্প্রতি দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ায় সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর পারস্পরিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
কারাচির স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি জানান, পাকিস্তানে এখন চতুর্থ প্রজন্মের বাঙালিরা বসবাস করছেন। তারা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

সংস্কৃতি ও পরিচয়ের পরিবর্তন
তবে সম্প্রদায়ের কিছু নেতা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাবে অনেকেই নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হারিয়েছেন। তবু তারা আশা করছেন, সম্পর্ক উন্নতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে প্রবাসী বাঙালিদের জীবনমান ও আত্মপরিচয় আরও শক্ত ভিত্তি পাবে।
এখন তাদের চোখ স্বদেশের দিকে। সরাসরি উড়ান শুধু ভ্রমণের সুযোগ নয়, এটি বহু বছরের বিচ্ছিন্ন পরিবারকে একত্র করার সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















