চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের মাঝে হঠাৎ করেই শান্তির আলোচনার সম্ভাবনা। কিন্তু সেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক কঠিন প্রস্তাব—ডনেতস্ক অঞ্চল ছেড়ে দিলে দেশের বাকি অংশে শান্তির প্রতিশ্রুতি মিলতে পারে। সীমান্তঘেঁষা শহরগুলোতে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের কাছে এই প্রস্তাব এখন গভীর উদ্বেগের নাম।
ডনেতস্ক নিয়ে আপসের চাপ
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ডনেতস্ক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনায় মূল প্রশ্ন দুটি—ডনেতস্কের নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। রাশিয়ার ধীর কিন্তু অব্যাহত অগ্রগতি দেখিয়ে কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছেন, সামরিকভাবে শেষ পর্যন্ত অঞ্চলটি হারাতেই হতে পারে, তাই রক্তপাত থামাতে এখনই আপস করা উচিত।
কিন্তু ইউক্রেনের নেতৃত্ব স্পষ্ট করেছে, একতরফাভাবে ডনেতস্ক ছেড়ে দেওয়া সংবিধানবিরোধী এবং ভবিষ্যতে আরও আগ্রাসনের দরজা খুলে দিতে পারে। হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে রক্ষিত ভূখণ্ড সহজে সমর্পণের প্রশ্নই ওঠে না—এমন বার্তাই বারবার উঠে এসেছে।
সীমান্ত শহরের মানুষের দুশ্চিন্তা
স্লোভিয়ানস্ক শহর, যা সম্মুখসারির মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে, এখনও সচল। রাস্তার ধারে কফিশপ, ফুলের দোকান, ব্যায়ামকেন্দ্র—সবই চলছে সৈন্য ও স্থানীয়দের ভরসায়। কিন্তু শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা এখানে উল্টো আতঙ্ক ডেকে এনেছে।
ডারিয়া বন্দরেভা নামের এক তরুণ উদ্যোক্তা দুই বছর আগে নিজের স্বপ্নের সৌন্দর্যকেন্দ্র খুলেছেন। তিনি আশঙ্কা করেন, ডনেতস্ক ছেড়ে দিলে তাঁর শহর রুশ নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। তাঁর কথায়, যদি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী থাকে তবে তিনি থেকে যেতে পারেন, কিন্তু রুশ প্রশাসনের অধীনে জীবন কাটানোর কথা ভাবতেই পারেন না।
এমন দ্বিধায় আছেন হাজারো মানুষ। কেউ ভাবছেন অন্যত্র চলে যাবেন, কেউ বলছেন জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়া অসম্ভব। প্রায় দুই লাখ মানুষের সামনে তখন দাঁড়াবে কঠিন সিদ্ধান্ত—পালাবেন, নাকি নতুন শাসনের অধীনে থাকবেন।
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও জীবন
বাখমুত, মারিউপোল কিংবা সিভিয়েরোদোনেৎস্কের মতো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও স্লোভিয়ানস্ক এখনও প্রাণবন্ত। হাজার হাজার সৈন্য এখানে অবস্থান করায় অর্থনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। রেস্তোরাঁয় সৈন্যদের ভিড়, সন্ধ্যায় নৃত্যশিক্ষা কেন্দ্রের ক্লাস—যুদ্ধের মাঝেও জীবনের চলমানতা চোখে পড়ে।
তবে আকাশজুড়ে ড্রোনের গুঞ্জন আর দূরের বিস্ফোরণের শব্দ মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, শান্তি এখনও দূরে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, রুশ অগ্রগতি অবশ্যম্ভাবী নয়। শক্ত প্রতিরক্ষা বলয়, মাইনফিল্ড আর ড্রোন ব্যবহারে ইউক্রেন সেনারা অগ্রযাত্রা থামাতে পারবে বলেই তাঁদের আশা।
ভারী মূল্য, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
এই যুদ্ধে উভয় পক্ষই বিপুল প্রাণহানির মুখে পড়েছে। সামান্য ভূখণ্ড দখলেও বড় ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—আর কতদিন এই লড়াই চলবে, আর কত প্রাণ যাবে?
অবসরপ্রাপ্ত নার্স রাফিলা মিরজায়েভা সম্প্রতি এক বিস্ফোরণে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছেন। তাঁর নাতনির শোবার ঘর কাঁচের টুকরোয় ভরে গিয়েছিল। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, এত কষ্টের পর তাঁদের গবাদিপশুর মতো হস্তান্তর করা উচিত নয়।
অন্যদিকে কিছু মানুষ নীরবে অপেক্ষা করছেন সম্ভাব্য পরিবর্তনের জন্য। কিন্তু অধিকাংশই বলছেন, তাঁরা ক্লান্ত, তবু আশা ছাড়েননি। তাঁদের প্রার্থনা—ডনেতস্ক যেন বিনিময়ের মুদ্রা না হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















