যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার হুমকি ঘিরে ইরানজুড়ে তৈরি হয়েছে যুদ্ধাবস্থার প্রস্তুতি। দেশজুড়ে বিক্ষোভ, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনার মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ভরসা রেখেছেন এক বিশ্বস্ত সহযোগীর ওপর। সেই ব্যক্তি হলেন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কার্যত তিনিই রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন।
খামেনির আস্থার কেন্দ্রে লারিজানি
জানুয়ারির শুরুতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার নিলে এবং যুক্তরাষ্ট্র হামলার হুমকি জোরালো করলে খামেনি দায়িত্ব দেন লারিজানিকে। অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও সাবেক বিপ্লবী গার্ডস কমান্ডার লারিজানি বর্তমানে নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং যুদ্ধ প্রস্তুতির প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন।
রক্ষণশীল বিশ্লেষক নাসের ইমানি তেহরান থেকে বলেন, খামেনির দীর্ঘদিনের আস্থা রয়েছে লারিজানির ওপর। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তীক্ষ্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা এবং নিরাপত্তা বিষয়ক জ্ঞানের কারণে সংকটকালে তাঁকেই উপযুক্ত মনে করছেন সর্বোচ্চ নেতা।
প্রেসিডেন্টের প্রভাব কমছে
এই সময়ে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের দৃশ্যমানতা কমেছে। একসময় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত পেজেশকিয়ান প্রকাশ্যেই বলেছেন, তিনি রাজনীতিক নন। এমনকি মন্ত্রিসভার বৈঠকেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে লারিজানির অনুমতির কথা উল্লেখ করতে হয়েছে তাঁকে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, প্রশাসনিক ভারসাম্য এখন লারিজানির দিকেই ঝুঁকেছে।
যুদ্ধ প্রস্তুতিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, দেশটি ধরে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা অনিবার্য। সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। পশ্চিম সীমান্তে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে ইসরায়েলে আঘাত হানা যায়। দক্ষিণ উপকূলে স্থাপন করা হয়েছে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করতে পারে।
সম্প্রতি একাধিকবার আকাশসীমা বন্ধ রেখে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানো হয়েছে। পারস্য উপসাগরে সামরিক মহড়া হয়েছে, এমনকি অল্প সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালিও বন্ধ রাখা হয়।
নেতৃত্ব রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা
খামেনি সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টা বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার পরিস্থিতিও বিবেচনায় রেখেছেন। সামরিক ও প্রশাসনিক পদে চার স্তরের বিকল্প নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনকি নিজের উত্তরসূরি নিয়েও গোপনে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বড় শহরগুলোতে বিশেষ পুলিশ, গোয়েন্দা সদস্য এবং বেসামরিক পোশাকধারী মিলিশিয়া মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দমন করা যায়।
কূটনীতির পাশাপাশি শক্তি প্রদর্শন
লারিজানি মস্কো সফর করে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনাও তদারকি করছেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে লারিজানি বলেছেন, ইরান যুদ্ধ চায় না, কিন্তু যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে কঠোর জবাব দেবে। তাঁর ভাষায়, গত কয়েক মাসে দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সংশোধন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনি একদিকে সম্ভাব্য শহীদ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্র কাঠামো টিকিয়ে রাখতে ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিন্যাস করছেন। উত্তরাধিকার এবং যুদ্ধ—দুই সম্ভাবনাকেই সামনে রেখে চলছে প্রস্তুতি।
ইরানের ভবিষ্যৎ কোন পথে
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব বুঝতে পারছে, যুদ্ধ শুরু হলে তার ফল অনিশ্চিত। তবু সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আলি লারিজানি এখন ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















