আমেরিকার সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কা ঘনিয়ে আসতেই ইরানের ক্ষমতার ভার কার্যত এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। দেশজুড়ে বিক্ষোভ, কূটনৈতিক চাপ এবং যুদ্ধের প্রস্তুতির মধ্যেই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ভরসা রেখেছেন তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আলি লারিজানির ওপর। ফলে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ভূমিকা অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
যুদ্ধের প্রস্তুতিতে নতুন শক্তিকেন্দ্র
জানুয়ারির শুরুতে বিক্ষোভ ও আমেরিকার হামলার হুমকির প্রেক্ষাপটে লারিজানিকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের শীর্ষ দায়িত্বে সামনে আনা হয়। গত কয়েক মাসে তার ক্ষমতার পরিধি দ্রুত বেড়েছে। সাম্প্রতিক ইসলামি শাসনবিরোধী আন্দোলন কঠোর হাতে দমন, ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণ, রাশিয়া, কাতার ও ওমানের মতো প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা—সব ক্ষেত্রেই তিনি এখন মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন।
এই মাসে দোহা সফরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লারিজানি বলেন, ইরান যুদ্ধ চায় না, তবে চাপিয়ে দেওয়া হলে জবাব দেবে। তার ভাষায়, গত কয়েক মাসে নিজেদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা ঠিক করা হয়েছে।
খামেনির কৌশলগত নির্দেশনা
শীর্ষ নেতার ঘনিষ্ঠ মহলের তথ্যমতে, সম্ভাব্য যুদ্ধ কিংবা শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর হামলার পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে একাধিক স্তরের উত্তরসূরি ঠিক করা হয়েছে। সামরিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে বিকল্প নেতৃত্ব নির্ধারণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বা সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতিতে কীভাবে রাষ্ট্র চলবে, সে পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
গত বছরের ইসরায়েলের আকস্মিক হামলা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। সেই হামলায় ইরানের সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশ প্রথম কয়েক ঘণ্টাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপরই প্রতিরক্ষা কাঠামো পুনর্গঠন ও নতুন জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদ গঠন করা হয়।
সামরিক সতর্কতা ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন
ইরানের সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। পশ্চিম সীমান্তে ইরাকসংলগ্ন এলাকায় এবং পারস্য উপসাগর তীরবর্তী অঞ্চলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আকাশসীমা বন্ধ রেখে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানো হয়েছে। পারস্য উপসাগরে সামরিক মহড়ার সময় হরমুজ প্রণালিও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথ।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বড় শহরগুলোতে বিশেষ পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, যাতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দমন করা যায়।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও ক্ষমতার ভারসাম্য
যুদ্ধের আশঙ্কার পাশাপাশি শীর্ষ নেতৃত্বের সম্ভাব্য অনুপস্থিতির প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। কে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন—এই প্রশ্নে লারিজানির নাম শীর্ষে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তার পরেই রয়েছেন পার্লামেন্টের স্পিকার ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। আলোচনায় সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির নামও এসেছে।
তবে এই সম্ভাব্য নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে প্রাণহানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রেসিডেন্টের সীমিত ভূমিকা
বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, তিনি মূলত একজন চিকিৎসক, রাজনীতিক নন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে লারিজানির অনুমোদনের প্রয়োজন হচ্ছে—এমন তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে বাস্তব ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়, তা নিয়ে আর তেমন সংশয় নেই বলে পর্যবেক্ষকদের মত।
ইরান এখন কূটনীতি ও যুদ্ধ—দুই পথেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে যেকোনো সামরিক সংঘাতের পরিণতি কতটা বিস্তৃত হবে, তা অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















