বিশ্বের বৃহৎ ক্রিপ্টো মুদ্রা লেনদেন প্ল্যাটফর্মের এক অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান ঘিরে নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে। ইরানের সঙ্গে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তথ্য উন্মোচনের পরই সংশ্লিষ্ট কয়েকজন তদন্ত কর্মকর্তাকে বরখাস্ত বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং ক্রিপ্টো বাজারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে।
ইরানের সঙ্গে এক দশমিক সাত বিলিয়ন ডলারের লেনদেনের অভিযোগ
কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, গত এক বছরে ইরানভিত্তিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানেরা দেড় হাজারের বেশি অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল। একই সময়ে দুটি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় এক দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার ইরান-সংযুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তরিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, যা বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের শঙ্কা তৈরি করেছে।
তদন্তকারীরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অন্তত চারজন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্রাহক তথ্য ব্যবস্থাপনায় প্রটোকল ভঙ্গের অভিযোগে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ঘটনার সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পূর্বের দোষ স্বীকার, জরিমানা ও কারাদণ্ড
২০২৩ সালে অর্থপাচারবিরোধী আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি দোষ স্বীকার করে এবং প্রায় চার দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে রাজি হয়। সে সময় ইরানসহ নিষিদ্ধ দেশগুলোর গ্রাহকদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে দেওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করা হয়। প্রতিষ্ঠাতাকে ২০২৪ সালে চার মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হয় এবং পরে তিনি প্রধান নির্বাহী পদ থেকে সরে দাঁড়ান, যদিও শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ তার কাছেই রয়ে যায়।
পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা আছে এমন বহু বিশেষজ্ঞ নিয়োগের কথা জানায়। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও প্রতিরোধে জোরদার নজরদারির আশ্বাসও দেওয়া হয়।

নতুন অনুসন্ধানে হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসে, যেটি প্ল্যাটফর্মটির আর্থিক অংশীদার হিসেবে কাজ করত। গত দুই বছরে ওই প্রতিষ্ঠানের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় এক দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার ইরান-সংযুক্ত ওয়ালেটে গেছে বলে নথিতে উল্লেখ আছে। এসব ওয়ালেটের কিছু ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তদন্তকারীরা সন্দেহ করেন।
এছাড়া ইসরায়েলের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্ত্রাসে অর্থায়নের সম্ভাব্য রুট নিয়ে যোগাযোগ করলে তদন্ত আরও বিস্তৃত হয়। একটি হংকংভিত্তিক কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় চারশো নব্বই মিলিয়ন ডলার ইরান-সংযুক্ত ওয়ালেটে পাঠানোর তথ্যও সামনে আসে। একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা কিছু রুশ জাহাজের ক্রুদের অর্থ পরিশোধে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার হয়েছে বলেও তদন্তে উঠে আসে।
প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা ও বিতর্ক
প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র দাবি করেছেন, উত্থাপিত অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহজনক লগইন চেষ্টার অর্থ এই নয় যে নিষিদ্ধ ব্যক্তিদের সেবা দেওয়া হয়েছে। হংকংভিত্তিক অংশীদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
তবে একাধিক কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন বলে জানা গেছে। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে, তদন্ত প্রতিবেদন সামনে আসার পর নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কি কেবল প্রটোকল ভঙ্গের কারণে, নাকি আরও বড় কোনো চাপ কাজ করেছে।
বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা ও ক্রিপ্টো নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রশ্ন
ইরান-সংযুক্ত লেনদেন এবং তদন্তকারীদের শাস্তির ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে ক্রিপ্টো বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক। বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে ডিজিটাল মুদ্রা প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কতটা কঠোর নজরদারি দরকার, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















