মানুষ আশা নিয়ে বাঁচে। কিন্তু সেই আশাই কখনো কখনো ভ্রান্ত বিশ্বাসে পরিণত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, স্বৈরশাসনের বাস্তবতা হঠাৎ করে নেমে আসে না; ধাপে ধাপে পরিস্থিতি খারাপ হয়, আর মানুষ তা স্বাভাবিক বলে মানিয়ে নেয়। আজ যা অস্বাভাবিক, কাল তা হয়ে ওঠে নিত্যদিনের ঘটনা। এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনই ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক।
নাৎসি বার্লিন: ভয়, সন্ত্রাস আর স্বাভাবিক জীবনের ভান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি শাসনের অধীনে বার্লিনে জীবন ছিল এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা। হাজার হাজার ইহুদিকে ট্রেনে তুলে পাঠানো হয়েছে গেটো ও মৃত্যু শিবিরে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে জোরপূর্বক শ্রম শিবির, প্রতিবেশীদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া, প্রকাশ্য সন্ত্রাস—সবই ঘটেছে মানুষের চোখের সামনে।
তারপরও অধিকাংশ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কেউ কেউ গ্রুনেওয়াল্ডের মতো অভিজাত এলাকায় দাঁড়িয়ে দেখেছে মানুষকে স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তবুও তারা দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে গেছে। ভয় ছিল একটি কারণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল এই বিশ্বাস যে পরিস্থিতি হয়তো এতটা খারাপ হবে না, অথবা শিগগিরই সব ঠিক হয়ে যাবে।
বোমাবর্ষণের মধ্যেও কনসার্ট
১৯৪৪ সালের শীতে যখন বার্লিনে দিনরাত বোমাবর্ষণ চলছিল, তখনও শহরে সংগীতানুষ্ঠান হয়েছে। ছিদ্রভরা ছাদের নিচে মোটা কোট গায়ে জড়িয়ে মানুষ বসে শুনেছে বার্লিন ফিলহারমনিকের পরিবেশনা। সিনেমা হল ভরা ছিল, নৃত্যানুষ্ঠান চলেছে, ফুটবল প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়নি। এমনকি যুদ্ধের শেষ পর্যায়েও মানুষ চিড়িয়াখানায় গেছে, হ্রদের ধারে রোদ পোহিয়েছে।
এ যেন এক ধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা। ভয়াবহ সময়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার কৌশল।

ধাপে ধাপে পতন
১৯৩৪ সালে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর থেকেই রাজনৈতিক নীতিনৈতিকতার ভাঙন শুরু হয়। ১৯৩৫ সালের বর্ণবাদী আইন ইহুদিদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়। কিন্তু ইহুদিরা ছিল জনসংখ্যার খুবই ক্ষুদ্র অংশ। তাই অধিকাংশ মানুষ ভাবল, এতে তাদের কিছু যায় আসে না। ১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়া দখল, তারপর চেকোস্লোভাকিয়ার অংশ দখল—প্রতিবারই অনেকেই বিশ্বাস করেছে, এটাই শেষ। আর বাড়বে না।
১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমণের পরও অনেক জার্মান মনে করেছিল, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে। এমনকি একজন ইহুদি ব্যাংকারও দেশপ্রেমের তাড়নায় যুদ্ধের জন্য আবেদন করেছিলেন। তিনি কোনো উত্তর পাননি। তবুও জীবন চলতে থেকেছে।
অলৌকিক অস্ত্রের অপেক্ষা
১৯৪৫ সালে যখন সোভিয়েত বাহিনীর গোলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল, শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছিল, তখনও অনেকে আশা করেছিল কোনো এক অলৌকিক অস্ত্র সব বদলে দেবে। এই আশা ছিল বাস্তবতার সঙ্গে বেমানান, তবুও মানুষ তা আঁকড়ে ধরেছিল।
আশা বনাম আত্মপ্রবঞ্চনা
আশা মানবিক গুণ। উন্নতির জন্য তা জরুরি। কিন্তু যখন আশা আমাদের বাস্তবতা অস্বীকার করতে শেখায়, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও ধীরে ধীরে নীতিনৈতিকতার সীমারেখা অতিক্রম হতে পারে। একের পর এক নিষিদ্ধ রেখা ভাঙা হয়, কিন্তু জীবন স্বাভাবিক গতিতেই চলতে থাকে। মানুষ ভাবে, এবার হয়তো সীমা ছাড়ানো হয়েছে, এবার নিশ্চয়ই সব থামবে।
কিন্তু সেই মুহূর্ত অনেক সময় আর আসে না। কারণ সীমা আগেই বহুবার অতিক্রম করা হয়েছে।
প্রস্তুতি ছাড়া আশা নয়
ভবিষ্যৎ ভালো হবে—এই বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার সঙ্গে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতিও জরুরি। ইতিহাস বলছে, শুধু আশায় ভর করে বসে থাকলে বিপর্যয় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। আর তখন প্রতিরোধের সময় অনেকটাই পেরিয়ে যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















