গাজা পুনর্গঠনে যে কোনো আন্তর্জাতিক উদ্যোগ—এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত নতুন ‘বোর্ড অব পিস’-এর অধীনেও—ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে বাদ দিলে তা টেকসই হবে না বলে সতর্ক করেছেন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এস্তেফান সালামেহ।
সম্প্রতি সিঙ্গাপুর সফরে দ্য স্ট্রেইটস টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গাজায় মাঠপর্যায়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে, সেগুলোর দায়িত্বে রয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। তাই নতুন কোনো কাঠামো দাঁড় করানোর পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবস্থা, আইন, সম্পত্তির অধিকার ও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।
গাজা পুনর্গঠন ও বোর্ড অব পিস নিয়ে অবস্থান
মন্ত্রী সালামেহ জানান, গাজায় যুদ্ধ বন্ধের তাগিদ থেকেই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বোর্ড অব পিসকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে তাঁর সংশয় রয়েছে। তাঁর ভাষায়, প্রতিশ্রুত অর্থ আর বাস্তবে অর্থছাড়—এই দুইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকে। আগে দেখা দরকার, ঘোষিত অর্থ সত্যিই আসে কি না।
![]()
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ডাভোস সম্মেলনের সাইডলাইনে ২২ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বোর্ড অব পিসের ঘোষণা দেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গাজায় একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠনের অনুমোদন দেয়, যা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার কর্মসূচি সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
এই সংস্থাকে গাজার পুনর্গঠন তদারকির জন্য যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, সমালোচকদের মতে এর লক্ষ্য জাতিসংঘের ভূমিকা খর্ব করে ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক শান্তিদূত ভাবমূর্তি জোরদার করা।
জাতীয় ঐক্য ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন
ড. সালামেহ বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ও ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে তাঁরা স্বাগত জানিয়েছেন একটাই কারণে—যুদ্ধ বন্ধ হোক, জনগণ স্বস্তি পাক। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা দেশের ঐক্য, জনগণের সংহতি এবং ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের জন্য অপরিহার্য।
তিনি বলেন, যে কোনো সহায়তা গ্রহণযোগ্য, যদি তা ফিলিস্তিনকে একটি দেশ ও একটি জাতি হিসেবে ধরে রাখার নীতিকে সম্মান করে এবং যুদ্ধোত্তর পুনরুদ্ধারে জনগণকে সহায়তা করে।
এ পর্যন্ত উপসাগরীয় দেশসমূহ, ইসরায়েল ও ইন্দোনেশিয়াসহ দুই ডজনের বেশি দেশ যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন এ উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। ঘোষিত প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।
হামাস-পরবর্তী বাস্তবতা ও আর্থিক সংকট
২০০৭ সালে হামাস গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কার্যত সেখানে সরাসরি শাসনক্ষমতা হারায়। তবু ড. সালামেহ জানান, এখনো গাজায় ৬৭ হাজারের বেশি কর্মচারী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির বেতন পরিশোধ করছে তাঁদের সরকার। গত দুই দশক ধরে পশ্চিম তীর ও গাজার বিচ্ছিন্নতার সময়েও সেবা ও বেতন প্রদান অব্যাহত ছিল।
তবে বাস্তবতা কঠিন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অর্থ মন্ত্রণালয় বর্তমানে কর রাজস্ব থেকে বঞ্চিত এবং ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণের বোঝা বহন করছে। এ অবস্থায় গাজা পুনর্গঠনে বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও অনিশ্চয়তা

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা রয়ে গেছে। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ইস্যু এখনো জটিল। হামাস গাজায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি বজায় রেখেছে এবং প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত রয়েছে।
ড. সালামেহ বলেন, যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হয়েছে—এমন নিশ্চয়তা নেই। যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েল দুই হাজার পাঁচশোর বেশি স্থাপনা ধ্বংস করেছে এবং পাঁচশোর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, যুদ্ধের রূপ বদলেছে, কিন্তু পুরোপুরি থামেনি। তাই নতুন করে লড়াই শুরুর আশঙ্কাই তাঁদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
সিঙ্গাপুর সফর ও রাষ্ট্রগঠন ভাবনা
২২ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিঙ্গাপুর সফরে ড. সালামেহ দেশটির প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং, ভারপ্রাপ্ত মুসলিম বিষয়ক মন্ত্রী ফয়সাল ইব্রাহিম এবং প্রতিমন্ত্রী ঝুলকারনাইন আবদুল রহিম ও রাহাইউ মাহজামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সংসদের বাজেট বিতর্ক অধিবেশনও পরিদর্শন করেন এবং ইন্সটিটিউট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন কলেজ ওয়েস্ট ঘুরে দেখেন।
সিঙ্গাপুরের কারিগরি শিক্ষা ও ডিজিটাল অর্থনীতির মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়াই ছিল তাঁর সফরের অন্যতম লক্ষ্য। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ-নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম তীরের অংশে এ ধরনের মডেল অনুসরণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সিঙ্গাপুর সম্প্রতি ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের জন্য সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছে এবং ২০২৬ সালের জন্য দুটি নতুন কোর্স চালু করেছে। ইসরায়েল-হামাস সংঘাত শুরুর পর থেকে সিঙ্গাপুর গাজার বেসামরিক মানুষের জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি মানবিক সহায়তা দিয়েছে; এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঘোষিত এক মিলিয়ন ডলারের সহায়তাও রয়েছে।
ড. সালামেহ বলেন, সিঙ্গাপুরের মানুষের আন্তরিকতা ও সংহতি তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। জনগণ ও প্রতিষ্ঠানকে দক্ষ করে তোলার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ ও ‘ডে আফটার’

ড. সালামেহ ফিলিস্তিনের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব—যেমন সিঙ্গাপুর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা—রাষ্ট্র কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি ‘ডে আফটার’ ধারণার কথা উল্লেখ করেন—অর্থাৎ সংঘাত-পরবর্তী এমন এক সময়, যখন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও ইসরায়েল দুই রাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তিতে পাশাপাশি সহাবস্থান করতে পারবে।
খ্রিস্টান ফিলিস্তিনি হিসেবে ড. সালামেহ সিঙ্গাপুরে আর্মেনিয়ান অ্যাপোস্টলিক চার্চ অব সেন্ট গ্রেগরি দ্য ইলুমিনেটর, সুলতান মসজিদ ও কাম্পং গ্ল্যাম এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরের মানুষের উষ্ণতা ও ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন তিনি আজীবন স্মরণে রাখবেন এবং তা নিজ জনগণের কাছে পৌঁছে দেবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















