মার্কিন সামরিক হামলার আশঙ্কা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ইরান নীরবে কিন্তু দ্রুতগতিতে যুদ্ধ প্রস্তুতি জোরদার করছে। একই সঙ্গে দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের রাজনৈতিক টিকে থাকার কৌশলও সাজিয়ে নিচ্ছে। এই সংকটময় সময়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিশ্বস্ত সহচর আলি লারিজানি কার্যত দেশের নিয়ন্ত্রণভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন।
খামেনির বিশ্বস্ত সহচরের উত্থান
জানুয়ারিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার হুমকির মুখে খামেনি ভরসা করেন তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী আলি লারিজানির ওপর। ৬৭ বছর বয়সী লারিজানি একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক, সাবেক বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার এবং বর্তমানে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান।
গত কয়েক মাসে তাঁর দায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক ইসলামি শাসনের অবসান দাবিতে হওয়া বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করার নেতৃত্বও ছিল তাঁর হাতে। এই প্রক্রিয়ায় প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
লারিজানির উত্থানের ফলে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কার্যত আড়ালে চলে গেছেন। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ থেকে রাজনীতিতে আসা এই প্রেসিডেন্ট একাধিকবার বলেছেন, তিনি রাজনীতিবিদ নন এবং দেশের বহুমুখী সংকট সমাধানের দায়িত্ব তাঁর একার নয়।

কূটনীতি ও যুদ্ধ প্রস্তুতি একসঙ্গে
বর্তমানে লারিজানি একদিকে ভেতরের ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণে রাখছেন, অন্যদিকে রাশিয়ার মতো শক্তিশালী মিত্র এবং কাতার ও ওমানের মতো আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনার তদারকিও করছেন তিনি।
ফেব্রুয়ারিতে দোহা সফরে এক সাক্ষাৎকারে লারিজানি বলেন, ইরান এখন আগের চেয়ে শক্তিশালী। গত সাত-আট মাসে দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সংশোধন করা হয়েছে। তারা যুদ্ধ চায় না, তবে চাপিয়ে দিলে জবাব দেওয়া হবে।
সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কতা
ছয়জন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ও বিপ্লবী গার্ডের তিন সদস্যের বরাতে জানা গেছে, ইরান ধরে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা প্রায় অনিবার্য। সে অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
ইরাক সীমান্তবর্তী পশ্চিমাঞ্চলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে, যেখান থেকে ইসরায়েল লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগর সংলগ্ন দক্ষিণ উপকূলেও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করা হয়েছে, যা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর নাগালের মধ্যে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান আকাশসীমা আংশিকভাবে বন্ধ রেখে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। পারস্য উপসাগরে সামরিক মহড়াও হয়েছে, এমনকি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।
খামেনির হুঁশিয়ারি
খামেনি প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন। এক ভাষণে তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী এমন আঘাত পেতে পারে, যার পর আর দাঁড়াতে পারবে না। তিনি হুমকি দিয়েছেন, প্রয়োজনে নিকটবর্তী জলসীমায় জড়ো হওয়া মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হবে।
অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা
যুদ্ধ শুরু হলে বড় শহরগুলোতে পুলিশ বিশেষ বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিপ্লবী গার্ড-সংযুক্ত বাসিজ মিলিশিয়াদের মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। তারা চেকপোস্ট বসিয়ে সম্ভাব্য অস্থিরতা ঠেকাবে এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করবে।
রাজনৈতিক টিকে থাকার হিসাব
ইরানি নেতৃত্ব শুধু সামরিক প্রস্তুতিই নিচ্ছে না, নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিকল্পনা করছে। যদি খামেনি বা শীর্ষ নেতারা নিহত হন, তখন কে দেশের দায়িত্ব নেবে—তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্বের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন আলি লারিজানি। তাঁর পরেই রয়েছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। অবাক করার মতোভাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির নামও বিবেচনায় এসেছে, যদিও তিনি খামেনির ঘনিষ্ঠ পরিমণ্ডল থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন।
তবে এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই আর্থিক দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে অন্তত সাত হাজার নিরস্ত্র প্রতিবাদকারী নিহত হওয়ার অভিযোগও তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প পরিকল্পনা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পরিণতি অনির্দেশ্য। আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক আলি ভায়েজ বলেন, খামেনি এখন আগের চেয়ে কম দৃশ্যমান এবং বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছেন। তবুও তিনিই পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে ধরে রাখার আঠা। তিনি না থাকলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এই সংকটের মধ্যেই ইরান একদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষমতার ভেতরের ভারসাম্য রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা নির্ভর করছে কূটনীতি ও সামরিক হিসাব-নিকাশের সূক্ষ্ম সমীকরণের ওপর।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















