চার বছর ধরে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর রাষ্ট্রনীতির মূল দিকনির্দেশনা স্থির করেছেন। শুরুতে ব্যর্থতার মুখে পড়লেও দীর্ঘ লড়াইয়ের পর রুশ সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে ঘুরে দাঁড়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনায় নিজেদের শর্ত তুলে ধরার অবস্থান তৈরি করে। কিন্তু এই একমুখী যুদ্ধকেন্দ্রিক নীতির মূল্য যে কতটা ভয়াবহ, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে রাশিয়ার অর্থনীতি ও সমাজে।
অর্ধেক বাজেটই যুদ্ধের পেছনে
বর্তমানে রাশিয়ার ফেডারেল বাজেটের প্রায় ৪০ শতাংশ সামরিক ও নিরাপত্তা খাতে ব্যয় হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধ, যা মোট বাজেটের আরও প্রায় ৯ শতাংশ। ফলে কার্যত অর্ধেকের কাছাকাছি অর্থই চলে যাচ্ছে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ব্যয়ে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিপুল ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কোনো ভিত্তি তৈরি হচ্ছে না। ট্যাঙ্ক, গোলাবারুদ, বোমা কিংবা সামরিক ভাতা—এসব খাতে ব্যয় রাষ্ট্রের স্থায়ী সম্পদে রূপ নিচ্ছে না। উন্নয়নমূলক অবকাঠামো, প্রযুক্তি বা শিল্প বৈচিত্র্য—সবই পিছিয়ে পড়ছে।

রাশিয়ার জাতীয় সঞ্চয় তহবিল থেকেও দ্রুত অর্থ তুলে নেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে তহবিলে শত শত বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সঞ্চয় ছিল, এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে, রাশিয়া সেখানে অস্ত্র উৎপাদনেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে রাশিয়ার অবস্থান ক্রমেই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।
যুদ্ধের ফলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রায় ছিন্ন হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে, উচ্চ সুদের হার দেশীয় বিনিয়োগকেও নিরুৎসাহিত করছে। যুদ্ধ অর্থনীতিকে সাময়িক চাঙ্গা করলেও এখন ব্যয় সংকোচন ও শ্রমবাজারে চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জনসংখ্যা সংকট আরও তীব্র
যুদ্ধ রাশিয়ার জনসংখ্যাগত সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিভিন্ন গবেষণা মতে, কয়েক লাখ রুশ সেনা নিহত হয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা একশো মিলিয়নের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেধাপ্রবাহের ক্ষতি। যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠ দমনে কঠোর আইনি ব্যবস্থার কারণে বিপুল সংখ্যক তরুণ ও দক্ষ মানুষ দেশ ছেড়েছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় হাজার হাজার মানুষ অভিযুক্ত হয়েছেন।
তরুণদের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে হতাশা বাড়ছে। একাধিক জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ রুশ নাগরিক যুদ্ধ থেকে সরে আসার পক্ষে মত দিচ্ছেন।
বিভক্ত অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি
যুদ্ধ অর্থনীতিকে দ্বিখণ্ডিত করেছে। সামরিক সংশ্লিষ্ট শিল্প বা বিদেশি কোম্পানি চলে যাওয়ার সুযোগে গড়ে ওঠা ব্যবসা খাত লাভবান হয়েছে। অন্যদিকে গ্যাস, গাড়ি ও কয়লা শিল্পে ধস নেমেছে। উৎপাদন কমেছে, ছোট ব্যবসা বাড়তি কর ও উচ্চ সুদের চাপে টিকে থাকার লড়াই করছে।
পেনশনভোগী ও সাধারণ নাগরিকেরা বাড়তি মূল্যস্ফীতি ও ইউটিলিটি বিলের চাপে পড়েছেন। তেল ও গ্যাস আয়ে পতনও অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলেছে।
ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শান্তি চুক্তির ওপর

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির শর্ত ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুনঃএকীভূত হওয়ার সক্ষমতার ওপর। বর্তমানে নিরাপত্তা ব্যয় ও ঋণের চাপ বাজেটের বড় অংশ গ্রাস করায় সামরিক বহির্ভূত খাতে কার্যত স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট পুতিন যুদ্ধকে রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে দেশটি এখন আগের চেয়ে বেশি চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে—তেল বিক্রি ও প্রযুক্তি আমদানির ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের দিকেও তাকিয়ে আছে মস্কো।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, যুদ্ধ রাশিয়াকে অতীতের শক্তির পুনরুত্থানের স্বপ্ন দেখালেও তার মূল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বহন করতে হতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















