একটি অপেরা কতটা শক্তিশালী হলে প্রথম মঞ্চায়নের পর দর্শক দীর্ঘক্ষণ নিঃশব্দ থাকে, তারপর হঠাৎ করতালিতে ফেটে পড়ে? ফিনল্যান্ডের প্রখ্যাত সুরকার কাইজা সারিয়াহোর ‘ইনোসেন্স’ সেই বিরল অভিজ্ঞতার নাম। সহিংস এক স্কুল গুলির ঘটনার পর শোক, অপরাধবোধ, মানসিক ভাঙন এবং পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা—সব মিলিয়ে এই অপেরা হয়ে উঠেছে সময়ের অন্যতম আলোচিত শিল্পকর্ম।
প্রথম মঞ্চায়নেই আলোড়ন
ফ্রান্সের গ্রাঁ থিয়েত্র দ্য প্রোভঁসে যখন ‘ইনোসেন্স’-এর প্রিমিয়ার হয়, তখন কেউ কল্পনাও করেননি এটি এত দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়মিশ্রিত আবেগে ভরা। অনেকে একে সরাসরি ‘মাস্টারপিস’ বলে উল্লেখ করেন।
অপেরাটি কেবল একটি অপরাধের গল্প নয়। এটি দেখায়, একটি সহিংস ঘটনার পর কত মানুষের জীবনে দীর্ঘ ছায়া নেমে আসে। ভুক্তভোগী পরিবার, অপরাধীর পরিবার, সহপাঠী, শিক্ষক—সবার ভেতরেই থেকে যায় গভীর মানসিক ক্ষত।

শেষ কাজ ভেবে শুরু
কাইজা সারিয়াহো অপেরা জগতে আসেন তুলনামূলক দেরিতে। তাঁর প্রথম অপেরা ‘লামুর দ্য লোয়াঁ’ ব্যাপক সাফল্য পায়। তবু ‘ইনোসেন্স’ শুরু করার সময় তিনি ঘনিষ্ঠজনদের বলেছিলেন, এটি হয়তো তাঁর শেষ বড় অপেরা। কারণ এমন কাজ তৈরি করতে দীর্ঘ সময়, ধৈর্য এবং মানসিক শক্তি লাগে।
লেখক সোফি অকসানেনের সঙ্গে মিলে তিনি কাহিনি গড়ে তোলেন। পরে তাঁর ছেলে আলেক্সি বারিয়ের যুক্ত হন নাট্যরূপ ও ভাষার সমন্বয়ে। অপেরাটিতে একাধিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক স্কুলের পরিবেশ আরও বাস্তব হয়ে ওঠে।
মঞ্চ ও সুরে সময়ের ভাঙাচোরা চিত্র
পরিচালক সাইমন স্টোন মঞ্চকে এমনভাবে সাজিয়েছেন, যেখানে অতীত ও বর্তমান একসঙ্গে উপস্থিত থাকে। একটি স্কুল ভবনের ভেতরে যেন স্মৃতি আর বর্তমান সময় একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়। হঠাৎ কোনো সংলাপ বা সুরে অতীতের ট্র্যাজেডি ফিরে আসে বর্তমানের মধ্যে।
সারিয়াহোর সুরে প্রতিটি চরিত্র আলাদা স্বর পায়। ভাষার উচ্চারণ, শব্দের টান, এমনকি সংলাপের ছন্দ—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় গভীর আবেগঘন পরিবেশ। সংগীত এখানে শুধু পটভূমি নয়, বরং গল্প বলার প্রধান মাধ্যম।

মহামারির বাধা, তবু থেমে যায়নি
২০২০ সালে মঞ্চায়নের পরিকল্পনা থাকলেও বিশ্বজুড়ে মহামারির কারণে তা স্থগিত হয়। একের পর এক প্রযোজনা বাতিল হয়। তবু সীমিত পরিসরে মহড়া চালু ছিল। অবশেষে এক বছর দেরিতে দর্শকের সামনে আসে অপেরা। সেই প্রত্যাবর্তন ছিল আরও আবেগঘন। দীর্ঘ বিরতির পর বড় মঞ্চে এমন শক্তিশালী কাজ দর্শকদের নাড়া দেয় গভীরভাবে।
লন্ডনের রয়্যাল অপেরা হাউস ও আমস্টারডামের ডাচ ন্যাশনাল অপেরায় মঞ্চায়নের সময় সারিয়াহো অসুস্থ শরীরেও উপস্থিত ছিলেন। ২০২৩ সালে তাঁর মৃত্যু হলেও ‘ইনোসেন্স’ থেমে থাকেনি। বরং প্রতিটি নতুন প্রযোজনায় এটি আরও গভীর, আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন শিল্পীরা।
এবার নিউইয়র্কে
আগামী ৬ এপ্রিল থেকে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন অপেরায় শুরু হচ্ছে ‘ইনোসেন্স’-এর নতুন মঞ্চায়ন। যুক্তরাষ্ট্রে স্কুল গুলির ঘটনা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তাই এই অপেরা সেখানে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

তবে নির্মাতারা বলছেন, এটি কেবল অস্ত্র বা আইন নিয়ে বিতর্ক নয়। বরং কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবারে না-বোঝার বেদনা এবং শোকের দীর্ঘ প্রভাব—এসবই মূল কেন্দ্র। যে কেউ নিজের জীবনের ক্ষতি, দুঃখ বা অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে এই অপেরায় নিজের প্রতিফলন খুঁজে পেতে পারেন।
এই কারণেই ‘ইনোসেন্স’ সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে এক সর্বজনীন শিল্পকর্ম হয়ে উঠেছে। কাইজা সারিয়াহোর শেষ সৃষ্টিটি আজ বিশ্বমঞ্চে নতুন করে মানবিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















