এক তরুণী, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে লড়ছেন, বৃহস্পতিবার আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে জানান, শৈশবে তিনি “সারাদিনই” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকতেন।
বর্তমানে ২০ বছর বয়সী এই তরুণী, যাকে আদালতের নথিতে কেজিএম নামে উল্লেখ করা হয়েছে, দাবি করেছেন অল্প বয়সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার তাকে প্রযুক্তির প্রতি আসক্ত করে তোলে এবং তার বিষণ্নতা ও আত্মহত্যাপ্রবণ চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এই মামলায় এখন অবশিষ্ট দুই বিবাদী হলো মেটা ও ইউটিউব। টিকটক ও স্ন্যাপ এরই মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছেছে।
এই মামলা আরও দুটি মামলার সঙ্গে ‘বেলওয়েদার ট্রায়াল’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে, অর্থাৎ এর রায় ভবিষ্যতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হাজারো অনুরূপ মামলার গতিপথ নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিচার চলাকালে তার আইনজীবীরা তাকে ক্যালি নামে উল্লেখ করেন। ক্যালি ৬ বছর বয়সে ইউটিউব এবং ৯ বছর বয়সে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার শুরু করেন।

অস্থির পারিবারিক পরিবেশ
গোলাপি ফুলের পোশাক ও হালকা বেইজ রঙের কার্ডিগান পরে ক্যালি সাক্ষ্য দিতে দাঁড়ান। তার আইনজীবী মার্ক ল্যানিয়ার বৃহস্পতিবার সকালে কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি খুবই নার্ভাস।
ল্যানিয়ার তার শৈশবের ছবি আদালতে উপস্থাপন করেন এবং ক্যালিফোর্নিয়ার চিকো শহরের এক শান্ত পাড়ায় বেড়ে ওঠার সময়কার সুখস্মৃতি নিয়ে প্রশ্ন করেন। ক্যালি জানান, থিমভিত্তিক জন্মদিনের অনুষ্ঠান, সিক্স ফ্ল্যাগসে ভ্রমণ এবং তার মা শৈশবকে বিশেষ করে তুলতে ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা করেছেন—এসব স্মৃতি তার মনে আছে।
তবে মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক সবসময় সহজ ছিল না। ক্যালি বলেন, তাদের বেশিরভাগ ঝগড়াই হতো তার ফোন ব্যবহারের বিষয় নিয়ে।
বাদী ও বিবাদী—উভয় পক্ষই ক্যালির অস্থির পারিবারিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলেছে। ক্যালির আইনজীবীরা দাবি করেছেন, দুর্বল অবস্থায় থাকায় তিনি প্ল্যাটফর্মগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। অন্যদিকে মেটা ও গুগলের মালিকানাধীন ইউটিউবের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন, ক্যালি মানসিক চাপে ভুগে এসব প্ল্যাটফর্মকে আশ্রয় বা পালানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করতেন।
মা তাকে আঘাত করেছেন, নির্যাতন করেছেন ও অবহেলা করেছেন—এমন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্যালি বলেন, “তিনি নিখুঁত ছিলেন না, কিন্তু সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।” তিনি স্পষ্ট করেন, আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি তার মায়ের আগের আচরণকে নির্যাতন বা অবহেলা বলতে চান না।
তবে পরে জেরা চলাকালে তিনি স্বীকার করেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় যখন তিনি নিজেকে আঘাত করতেন, তখন তার মা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনমূলক আচরণ করতেন।
বর্তমানে ক্যালি একটি খুচরা বিপণি প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত ক্রেতা সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং শৈশবের সেই বাড়িতেই মায়ের সঙ্গে বসবাস করছেন।

নোটিফিকেশন থেকে ‘উত্তেজনা’
শৈশবে ক্যালি ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন, যাতে নিজের পোস্টে নিজেই লাইক ও মন্তব্য করতে পারেন। তিনি জানান, এমন এক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি লাইক “কিনতেন”, যেখানে অন্যদের ছবিতে লাইক দিলে নিজের ছবিতেও একসঙ্গে বহু লাইক পাওয়া যেত। তার ভাষায়, এতে তাকে জনপ্রিয় দেখাত।
বাদীপক্ষের দাবি, কিছু ফিচার ইচ্ছাকৃতভাবে আসক্তি তৈরির জন্য নকশা করা হয়েছে—এর মধ্যে নোটিফিকেশন অন্যতম। ক্যালি বলেন, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের নোটিফিকেশন তাকে একধরনের উত্তেজনা দিত। সারাদিনই তিনি এসব নোটিফিকেশন পেতেন এবং স্কুল চলাকালেও বাথরুমে গিয়ে সেগুলো দেখতেন—যা এখনো করেন।
তিনি জানান, বর্তমানে ইউটিউব কম ব্যবহার করলেও আগে তিনি আসক্ত ছিলেন বলে মনে করেন। “নিজের জন্য সীমা নির্ধারণের চেষ্টা করলেও কাজ করত না, আমি বের হতে পারতাম না,” বলেন ক্যালি।
ইনস্টাগ্রামের ফিল্টার, বিশেষ করে যেগুলো চেহারায় কসমেটিক পরিবর্তন আনে, মামলায় বড় একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। আদালতে প্রায় ৩৫ ফুট লম্বা ক্যানভাস ব্যানারে ক্যালির পোস্ট করা ছবিগুলো প্রদর্শন করা হয়। তিনি বলেন, “প্রায় সব” ছবিতেই ফিল্টার ব্যবহার করা ছিল।
জুরি বোর্ডকে তার শৈশব ও কৈশোরের ভিডিও ও পোস্টও দেখানো হয়। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ১০০ সাবস্ক্রাইবার অতিক্রম করার পর তিনি “আনন্দাশ্রু” ঝরাচ্ছেন বলে জানান, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের চেহারা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে তাকে বলতে শোনা যায়, “এই শার্টে আমাকে খুব মোটা দেখাচ্ছে।”
ক্যালি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফিল্টার ব্যবহার শুরু করার আগে শরীর-সংক্রান্ত বিকৃত ধারণা নিয়ে এমন নেতিবাচক অনুভূতি তার ছিল না।

মেটার যুক্তি ও জেরা
মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার শুরুর আগেই ক্যালি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিলেন। কোম্পানির আইনজীবী পল শ্মিট বলেন, মূল প্রশ্ন হলো প্ল্যাটফর্মগুলো তার মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল কি না।
মেটার আরেক আইনজীবী ফিলিস জোনস জেরা চলাকালে ভদ্র ও সম্মানজনক ভঙ্গিতে কথা বলেন এবং স্বীকার করেন, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অপরিচিতদের সামনে কথা বলা অস্বস্তিকর হতে পারে। তিনি ক্যালির পারিবারিক জীবন নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন তোলেন।
জোনস ক্যালির মানসিক অবস্থা ও মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ইনস্টাগ্রামে করা পোস্ট ও বার্তালাপ আদালতে উপস্থাপন করেন এবং মায়ের চিৎকারের ভিডিওও দেখান।
প্রায় ২০ বার তিনি ২০২৫ সালের জবানবন্দির প্রতিলিপি দেখিয়ে ক্যালির বর্তমান সাক্ষ্যের সঙ্গে অসঙ্গতি তুলে ধরেন। পরিবারের নির্দিষ্ট আচরণ বা অভিজ্ঞতা তার মানসিক স্বাস্থ্যে কী প্রভাব ফেলেছিল—এমন প্রশ্নে ক্যালি বৃহস্পতিবার বলেন, সেগুলো তেমন প্রভাব ফেলেনি বা উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় বড় অবদান রাখেনি। কিন্তু এক বছর আগের জবানবন্দিতে প্রায়ই উল্টো কথা বলা ছিল।
এ বিষয়ে ক্যালি বলেন, “আমি যথাসাধ্য সঠিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি, তবে কখনো কখনো ভুল বলতে পারি।”
জোনস নিশ্চিত করেন, কোনো চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কখনো তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত বলে নির্ণয় করেননি, ইনস্টাগ্রামে আসক্তির চিকিৎসাও দেননি বা ব্যবহার সীমিত করতে বলেননি। ক্যালি জানান, তিনি নিজে কখনো অতিরিক্ত ব্যবহার বা আসক্তির বিষয়টি চিকিৎসকদের সামনে তোলেননি, কারণ তার আশঙ্কা ছিল তারা হয়তো পুরোপুরি প্ল্যাটফর্ম ছাড়তে বলবেন, যা তিনি চাননি।

থেরাপিস্টের বক্তব্য
২০১৯ সালে ক্যালির সঙ্গে কাজ করা তার সাবেক থেরাপিস্ট ভিক্টোরিয়া বার্ক বুধবার সাক্ষ্য দেন। তিনি বলেন, ক্যালির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও তার আত্মপরিচয়ের বোধ “ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত” ছিল। প্ল্যাটফর্মে কী ঘটছে, তা তার মেজাজ “গড়ে দিতে বা ভেঙে দিতে” পারত।
মেটার আইনজীবী দীর্ঘ প্রায় তিন ঘণ্টার জেরায় বার্কের সেশন নোট বিশদভাবে পর্যালোচনা করেন। সেখানে স্কুলে সরাসরি হয়রানি, অন্যান্য চাপ ও উদ্বেগ এবং পারিবারিক সমস্যার উল্লেখ ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং তা মূলত এই অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত ছিল যে ক্যালি বাড়ি, স্কুল বা সহপাঠীদের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেতেন না, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে দৃশ্যমান করার একটি জায়গা পেতেন।
বার্কের সঙ্গে ক্যালির চিকিৎসা প্রায় ছয় মাস স্থায়ী হয়েছিল, যা সাত বছর আগে ঘটে।
মামলাটি আরও কয়েক সপ্তাহ চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জুরির রায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অসংখ্য অনুরূপ মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মেটা নিউ মেক্সিকোতেও একটি পৃথক বিচারের মুখোমুখি।
ইউএনবি 



















