মার্কিন সামরিক বাহিনী টেক্সাসের যুক্তরাষ্ট্র–মেক্সিকো সীমান্তের কাছে একটি ‘সম্ভাব্য হুমকিস্বরূপ’ ড্রোনকে লেজার অস্ত্র ব্যবহার করে ভূপাতিত করেছে। পরে জানা যায়, ড্রোনটি ছিল কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের মালিকানাধীন। এই ভুল শনাক্তকরণের ঘটনায় ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ফোর্ট হ্যানকক এলাকার অতিরিক্ত আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। এল পাসো শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ওই এলাকায় সামরিক বাহিনীকে দেশের আকাশসীমায় যেকোনো ড্রোনবিরোধী পদক্ষেপের আগে এফএএকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হয়।
দুই সপ্তাহে দ্বিতীয়বার লেজার ব্যবহারের ঘটনা
গত দুই সপ্তাহে এটি দ্বিতীয়বার, যখন ওই অঞ্চলে লেজার অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। আগেরবার কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন নিজেই লেজার ব্যবহার করেছিল, তবে কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত লাগেনি। সেই ঘটনাটি ফোর্ট ব্লিসের কাছে ঘটে এবং তখন এফএএ এল পাসো বিমানবন্দর ও আশপাশের আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। তবে সর্বশেষ ঘটনায় আকাশসীমা বন্ধের পরিধি ছিল ছোট এবং বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচলে প্রভাব পড়েনি।

কংগ্রেস সদস্যদের ক্ষোভ
ওয়াশিংটনের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রিক লারসেনসহ হাউস ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কমিটির দুই শীর্ষ সদস্য এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানার পর বিস্ময় প্রকাশ করেন। যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, এই খবর শুনে তারা হতবাক। তাদের অভিযোগ, ড্রোন পরিচালকদের প্রশিক্ষণ এবং পেন্টাগন, এফএএ ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে যে দ্বিদলীয় বিল আনা হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন তা পাশ কাটিয়ে গেছে। এর ফলেই এমন অদক্ষতার চিত্র সামনে এসেছে বলে তারা মন্তব্য করেন।
সরকারের যৌথ ব্যাখ্যা
এফএএ, কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন এবং পেন্টাগন এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, সামরিক আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি সম্ভাব্য হুমকিমূলক ড্রোন মোকাবিলায় সামরিক বাহিনী ড্রোনবিরোধী কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেছে। তারা দাবি করে, ঘটনাটি জনবসতি ও বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ চলাচল থেকে অনেক দূরে ঘটেছে এবং সীমান্ত সুরক্ষা জোরদারের অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশনায় প্রতিরক্ষা দপ্তর, এফএএ এবং কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন যুক্তরাষ্ট্র–মেক্সিকো সীমান্তে মেক্সিকান কার্টেল ও বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের ড্রোন হুমকি মোকাবিলায় নজিরবিহীনভাবে একসঙ্গে কাজ করছে।
এল পাসোতে আগের ঘটনার প্রভাব
দুই সপ্তাহ আগে এল পাসোতে আকাশসীমা কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকলেও প্রায় সাত লাখ জনসংখ্যার শহরটিতে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল হয় এবং উদ্বেগ তৈরি হয়। সে সময় কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন এফএএর সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই লেজার মোতায়েন করেছিল বলে জানা যায়। পরে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এফএএ আকাশসীমা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।
ঘটনার পর কংগ্রেসের সদস্যরা বলেন, এটি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার আরেকটি উদাহরণ। পরিবহন সচিব শন ডাফি জানান, তিনি কংগ্রেস সদস্যদের এ বিষয়ে ব্রিফ করবেন। তার মতে, আকাশসীমা বন্ধের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না এবং এটি কেবল যোগাযোগ সমস্যার ফল নয়।
স্বাধীন তদন্তের দাবি
ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ট্যামি ডাকওয়ার্থ, যিনি সিনেটের এভিয়েশন সাবকমিটির শীর্ষ সদস্য, এ ঘটনার স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছেন। তার অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের অদক্ষতা আকাশপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
গত বছর ওয়াশিংটনের কাছে একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ও সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারের মাঝআকাশে সংঘর্ষে ৬৭ জন নিহত হওয়ার তদন্তে দেখা যায়, এফএএ ও পেন্টাগনের মধ্যে নিরাপত্তা তথ্য আদানপ্রদানে ঘাটতি ছিল। রিগ্যান ন্যাশনাল বিমানবন্দরের আশপাশে বিপজ্জনক ঘনিষ্ঠ উড্ডয়নের তথ্য তারা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করেনি এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় যথাযথ পদক্ষেপও নেয়নি।

ড্রোন হুমকি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
দুই মাস আগে কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নেয়, যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হলে কিছু অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও বিপজ্জনক ড্রোন ভূপাতিত করার ক্ষমতা দেওয়া হবে। আগে এ ক্ষমতা সীমিত কয়েকটি ফেডারেল সংস্থার হাতে ছিল।
ইউক্রেনে সশস্ত্র ড্রোনের বিধ্বংসী ব্যবহার এবং রাশিয়ার ভেতরে আঘাত হানার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ড্রোন হুমকি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিশ্বকাপ ম্যাচ এবং স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপন সামনে রেখে অঙ্গরাজ্যগুলোকে প্রস্তুত করতে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। চলতি বছর আরও ২৫০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দেশের ড্রোন প্রতিরক্ষা আরও জোরদার হয়।
সীমান্ত ও আকাশপথে বাড়ছে ঝুঁকি
মেক্সিকো সীমান্তে মাদক কার্টেলগুলো নিয়মিত ড্রোন ব্যবহার করে মাদক পাচার ও সীমান্ত টহল নজরদারি করে। কর্মকর্তারা কংগ্রেসকে জানান, ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে দক্ষিণ সীমান্তের ৫০০ মিটারের মধ্যে ২৭ হাজারের বেশি ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছে।

দেশজুড়ে নিবন্ধিত ড্রোনের সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি। বিমানবন্দরের আশপাশে ড্রোনের সঙ্গে উড়োজাহাজের অল্পের জন্য রক্ষা পাওয়ার ঘটনা বাড়ছে।
ড্রোন প্রতিরোধে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। কিছু ব্যবস্থা রেডিও সংকেত বিঘ্নিত করে ড্রোন অচল করে, কিছু উচ্চক্ষমতার মাইক্রোওয়েভ বা লেজার রশ্মি ব্যবহার করে। আবার কোথাও ছোট ড্রোন পাঠিয়ে হুমকিস্বরূপ ড্রোনকে ধাক্কা দিয়ে নামানো হয়। গুলি ব্যবহারকারী ব্যবস্থাও রয়েছে, তবে সেগুলো বেশি ব্যবহৃত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে, দেশের ভেতরে নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















