পাকিস্তানের কাবুলে বোমাবর্ষণ এবং তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধঘোষণা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইসলামাবাদ এখন ক্রমশ এমন এক নিরাপত্তা রাষ্ট্রে রূপ নিচ্ছে, যেখানে প্রতিবেশী সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক সংলাপের বদলে সামরিক শক্তিকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব কার্যত পেছনের সারিতে সরে যাচ্ছে, আর সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রভাব আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
সীমান্তে অভিযানের সূচনা
শুক্রবার ভোরে পাকিস্তান ‘গজব লিল হক’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। ইসলামাবাদের দাবি, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় তালেবানের উসকানিমূলক গুলিবর্ষণের জবাব দিতেই এই পদক্ষেপ। অভিযানে কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ার একাধিক সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলার কথা জানানো হয়েছে।
চলমান সংঘর্ষে পাকিস্তানের দুই নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের দাবি, ১৩৩ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি এখনও উত্তপ্ত।

রাজনৈতিক সমাধানের পথ এড়িয়ে সামরিক কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, তালেবান ও পশতুন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। সোভিয়েত দখলদারিত্ব এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের সময় বহু আফগান পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান ইস্যুতে সমাধানের চেষ্টা করা যেত।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার কার্যত সেনাবাহিনীর কাছে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্র ছেড়ে দিয়েছে। ফলে কূটনৈতিক পথের বদলে সামরিক কৌশলই প্রাধান্য পাচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে সেনাপ্রধানের অবস্থান মজবুত হলেও গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হচ্ছে।

দোষারোপ আর বাস্তবতা
ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আফগান তালেবান তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে আশ্রয় ও মদদ দিচ্ছে। তবে সমালোচকদের মতে, এই গোষ্ঠীগুলোর জন্ম ও বিকাশ পাকিস্তানের গভীর রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই হয়েছে। এখন সেই শক্তিই উল্টো চাপ সৃষ্টি করছে।
পাকিস্তান আকাশপথে সামরিক সুবিধা পেলেও স্থলযুদ্ধে তালেবান পশতুন যোদ্ধারা কঠিন প্রতিপক্ষ। ইতিহাস বলছে, তারা সোভিয়েত ও মার্কিন শক্তিকেও দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বিদায় করতে বাধ্য করেছে। ফলে এই সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে।
দুই সীমান্তে চাপ, গণতন্ত্রের সামনে সংকট
বর্তমানে পাকিস্তান পূর্ব ও পশ্চিম—দুই সীমান্তেই সামরিক চাপের মুখে। এই পরিস্থিতি সেনাবাহিনীর প্রভাব বাড়ালেও বহু দলীয় গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ডুরান্ড রেখা ঘিরে প্রতিশোধমূলক অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আফগানিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত গভীরতা হিসেবে দেখার নীতি ভেঙে পড়ছে। তালেবান নিজেদের জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে এবং প্রয়োজনে সরাসরি রাওয়ালপিন্ডির মোকাবিলায় প্রস্তুতির বার্তা দিচ্ছে।

দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকটের আশঙ্কা
কাবুল ও কান্দাহারে হামলার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান হয়তো তাৎক্ষণিক শক্তির প্রদর্শন করেছে। কিন্তু এতে ভবিষ্যতে আরও বড় নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। সামরিক নেতৃত্ব হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু এর মূল্য দিতে হতে পারে সাধারণ নাগরিকদের।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি এক নতুন ‘হাজার ক্ষতের যুদ্ধ’। আর এবার সেই ক্ষতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাকিস্তান নিজেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















