যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নজরদারি কমিটির সামনে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে তার কোনো সাক্ষাৎ বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের স্মৃতি নেই। এপস্টেইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও তার কাছে কোনো তথ্য নেই বলে দাবি করেন তিনি।
নিউ ইয়র্কের চাপাকুয়ায় এক গোপন জবানবন্দির পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হিলারি বলেন, তিনি কখনও এপস্টেইনের বিমানে ভ্রমণ করেননি, তার দ্বীপ, বাড়ি বা দপ্তরেও যাননি। দীর্ঘ সাত ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদে একই প্রশ্ন বারবার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।

এপস্টেইন বিতর্কে সরব কংগ্রেস
কংগ্রেসের নজরদারি কমিটি এপস্টেইনের আর্থিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। সেই তদন্তের অংশ হিসেবেই হিলারি ক্লিনটনকে ডাকা হয়। জবানবন্দির শেষ দিকে তাকে ইউএফও এবং তথাকথিত ‘পিজাগেট’ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হয় বলেও জানান তিনি।
২০১৬ সালে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিত্তিহীন গুজবে দাবি করা হয়েছিল, ওয়াশিংটনের একটি পিৎজার দোকান শিশু পাচার চক্রের আড়াল এবং সেটির সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের যোগ রয়েছে। হিলারি এটিকে ‘অত্যন্ত নোংরা ও মিথ্যা’ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পকে ঘিরে পাল্টা অভিযোগ
নিজের লিখিত বক্তব্যে হিলারি ক্লিনটন অভিযোগ করেন, রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন এই কমিটি আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্ক থেকে দৃষ্টি সরাতে চাইছে। ২০১৯ সালে কারাগারে আত্মহত্যা করেন এপস্টেইন, তখন তিনি ফেডারেল মানবপাচার মামলার বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন।
হিলারি আরও দাবি করেন, ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক যৌন পাচার দমন সংক্রান্ত পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় দুর্বল করে দিয়েছে।
তবে কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার বলেন, এই তদন্ত কোনো পক্ষপাতদুষ্ট উদ্যোগ নয়। তিনি জানান, ট্রাম্প ইতিমধ্যে বহু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবং বিভিন্ন নথি প্রকাশ করেছেন। এই মুহূর্তে ট্রাম্পকে ডাকার প্রয়োজন দেখছেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিল ক্লিনটনের সাক্ষ্য আজ
হিলারির স্বামী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনেরও সাক্ষ্য নেওয়ার কথা রয়েছে। হিলারি জানান, এপস্টেইনের ২০০৮ সালের দোষ স্বীকারের আগে যাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল, তাদের ‘বেশিরভাগই’ অপরাধ সম্পর্কে জানতেন না—এই অবস্থানই তুলে ধরবেন বিল ক্লিনটন।
তদন্তে উঠে এসেছে, প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর দুই হাজারের দশকের শুরুতে বিল ক্লিনটন একাধিকবার এপস্টেইনের বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন। তবে তিনি কোনো অপরাধ অস্বীকার করেছেন এবং সেই সম্পর্ক নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

নিখোঁজ নথি নিয়ে প্রশ্ন
কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য রবার্ট গার্সিয়া অভিযোগ করেছেন, বিচার বিভাগ এপস্টেইন-সংক্রান্ত প্রায় ত্রিশ লাখ নথির মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছে। তার দাবি, এক নারীর অভিযোগ ছিল যে তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় ট্রাম্পের যৌন নিপীড়নের শিকার হন—সেই নথিও প্রকাশ করা হয়নি।
গার্সিয়া প্রশ্ন তুলেছেন, নথিগুলো কোথায় গেল এবং কে সেগুলো সরাল। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, কোনো নথি ভুলভাবে আটকে রাখা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে প্রকাশ করা হবে।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত এপস্টেইন ইস্যুতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনেনি। তবে নব্বই ও দুই হাজারের দশকের শুরুতে ট্রাম্প ও এপস্টেইনের সামাজিক যোগাযোগ ছিল বলে বিভিন্ন নথিতে উঠে এসেছে।

হোয়াইট হাউসেও গিয়েছিলেন এপস্টেইন
জেমস কোমারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিল ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট থাকাকালে এপস্টেইন অন্তত সতেরোবার হোয়াইট হাউসে গিয়েছিলেন। বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে শুধু ক্লিনটন নয়, আরও বহু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এপস্টেইনের যোগাযোগের তথ্য উঠে এসেছে।
এই কেলেঙ্কারি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রভাব ফেলেছে। ব্রিটেনের সাবেক ডিউক অব ইয়র্ক অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়েছে।
পুরো ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। হিলারি ক্লিনটনের জবানবন্দি সাময়িকভাবে প্রশ্নের জবাব দিলেও, এপস্টেইন তদন্ত যে এখনও শেষ হয়নি—তা স্পষ্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















