পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া সীমান্তে আফগান তালেবানের উসকানিহীন গোলাবর্ষণের জেরে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার সীমান্তের একাধিক স্থানে হামলার পর ইসলামাবাদ ‘গজব লিল হক’ নামে পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে। এ ঘটনার পর দেশটির সরকার ও বিরোধী—সব রাজনৈতিক শিবির এক কণ্ঠে সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়িয়েছে।
সীমান্তে সংঘাত ও পাল্টা অভিযান
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ জানায়, সীমান্তে আফগান দিক থেকে হঠাৎ গোলাবর্ষণ শুরু হলে সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিক জবাব দেয়। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের লক্ষ্য ছিল সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার পথ বন্ধ করা।
নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, পাল্টা অভিযানে শত্রুপক্ষের একটি অবস্থান দখল করা হয়েছে এবং তাদের পিছু হটতে বাধ্য করা হয়েছে। পরিস্থিতি এখনও উত্তেজনাপূর্ণ হলেও ইসলামাবাদ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—দেশের সার্বভৌমত্বে কোনো আপস হবে না।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কড়া বার্তা
রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারি বলেন, পাকিস্তান শান্তিতে বিশ্বাসী, কিন্তু শান্তিকে দুর্বলতা মনে করলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। তিনি জানান, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়া ছিল পূর্ণাঙ্গ ও সিদ্ধান্তমূলক।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সরকার ও জনগণ সবসময় প্রস্তুত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রিয় মাতৃভূমির প্রতিরক্ষায় কোনো আপস হবে না এবং প্রতিটি আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিস্ফোরক মন্তব্য
প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ আফগান তালেবানের পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, তালেবান দেশটিকে ভারতের প্রভাববলয়ে পরিণত করেছে এবং সন্ত্রাস রপ্তানি করছে।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান বহু বছর ধরে কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে শক্ত জবাব ছাড়া বিকল্প থাকে না। তাঁর ভাষায়, পাকিস্তানের বাহিনী যে কোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় সম্পূর্ণ সক্ষম।
প্রাদেশিক নেতৃত্বের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান
বালুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি বলেন, সীমান্তে উসকানিহীন হামলার তাৎক্ষণিক ও কার্যকর জবাব দেওয়া হয়েছে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সাইয়্যেদ আসিম মুনিরের নেতৃত্বে। তিনি সতর্ক করেন, সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয় কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ সংক্ষিপ্ত বার্তায় বলেন, পাকিস্তান দীর্ঘজীবী হোক। সিন্ধুর জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী শরজিল মেমন কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে একই স্লোগান উচ্চারণ করেন।

জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিক বলেন, সমগ্র জাতি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আছে। তাঁর অভিযোগ, আফগানিস্তান আঞ্চলিক শান্তি নষ্ট করছে এবং ভারতের প্ররোচনায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
বিরোধী দলও একই সুরে
পিটিআই চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গোহর খান বলেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করা হবে যেখানে সম্ভব, কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হুমকির জবাব দিতে দ্বিধা করা হবে না। তাঁর মতে, পূর্ণ শক্তিতে আগ্রাসনের মোকাবিলা করা হবে এবং জাতির দোয়া সেনাবাহিনীর সঙ্গে আছে।
আইন ও বিচার প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার আকিল মালিক বলেন, পাকিস্তান সবসময় আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে। তবে সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রশ্নে কোনো আপস নয়। তাঁর দাবি, সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সময়োপযোগী পদক্ষেপ শত্রুপক্ষকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।

বাড়ছে কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন
সাম্প্রতিক ঘটনায় ইসলামাবাদ-কাবুল সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের দাবি, তারা দীর্ঘদিন ধরে লক্ষাধিক আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজ করেছে। কিন্তু সীমান্তে ধারাবাহিক উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্কে গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করবে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও সামরিক সংযমের ওপর। তবে আপাতত পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এক বার্তাই দিচ্ছে—দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সবাই ঐক্যবদ্ধ।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















