কয়েক দশক ধরে আফগান তালেবানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল পাকিস্তান। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তালেবানের উত্থানে ইসলামাবাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় “কৌশলগত গভীরতা” অর্জনের লক্ষ্যেই পাকিস্তান তালেবানকে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু সেই সম্পর্ক আজ তীব্র সংঘাতে রূপ নিয়েছে। কীভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হল?
শুক্রবার ইসলামাবাদ ও কাবুলের কর্মকর্তারা জানান, পাকিস্তান রাতভর আফগানিস্তানের প্রধান শহরগুলোতে বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে দুই ইসলামী প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সীমান্ত সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, আফগানিস্তান পাকিস্তানি সীমান্তরক্ষীদের ওপর হামলা চালানোর পর পাকিস্তান পাল্টা বিমান ও স্থল অভিযান শুরু করে। সীমান্তের বিভিন্ন সেক্টরে তালেবান সামরিক পোস্ট, সদর দপ্তর ও গোলাবারুদের গুদাম লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
উভয় পক্ষই সংঘর্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই পরিস্থিতিকে “খোলাখুলি যুদ্ধ” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
গত সপ্তাহান্তে পাকিস্তান আফগানিস্তানে জঙ্গি ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালানোর পর থেকেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এর আগে অক্টোবর মাসে সীমান্ত সংঘর্ষে দুই দেশের কয়েক ডজন সেনা নিহত হয়। তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় আলোচনার মাধ্যমে শত্রুতা থেমে যায় এবং একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে তা স্থায়ী হয়নি।

প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কে ভাঙন কেন
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর পাকিস্তান তা স্বাগত জানায়। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন, আফগানরা “দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলেছে”। কিন্তু খুব দ্রুতই ইসলামাবাদ বুঝতে পারে, তালেবান তাদের প্রত্যাশামতো সহযোগী হয়ে ওঠেনি।
পাকিস্তানের অভিযোগ, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির নেতৃত্ব ও বহু যোদ্ধা আফগানিস্তানে অবস্থান করছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিও আফগান ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে।
একটি বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছরই জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে। টিটিপি ও বেলুচ বিদ্রোহীদের হামলার সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে কাবুল বারবার অস্বীকার করেছে যে, পাকিস্তানে হামলা চালাতে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আফগান তালেবানের অভিযোগ, পাকিস্তান তাদের শত্রু ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে। ইসলামাবাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পাকিস্তানের দাবি, আফগান ভূখণ্ড থেকে জঙ্গি হামলা অব্যাহত থাকায় যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরপর থেকে সীমান্তে বারবার সংঘর্ষ ও সীমান্ত বন্ধের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে বাণিজ্য ও মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়েছে।

সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে
গত সপ্তাহান্তের হামলার আগের দিন পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্র জানায়, আফগানিস্তানে অবস্থানরত জঙ্গিরাই সাম্প্রতিক আত্মঘাতী বোমা হামলা ও সশস্ত্র আক্রমণের পেছনে রয়েছে—এমন “অখণ্ড প্রমাণ” তাদের হাতে আছে। এসব হামলায় পাকিস্তানের সামরিক ও পুলিশ সদস্যরা লক্ষ্যবস্তু ছিল।
নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে অন্তত সাতটি পরিকল্পিত বা সফল হামলার সঙ্গে আফগান সংযোগ রয়েছে। গত সপ্তাহে বাজাউর জেলায় এক হামলায় ১১ জন নিরাপত্তা সদস্য ও দুইজন বেসামরিক নিহত হন। পাকিস্তানি সূত্রের দাবি, হামলাটি একজন আফগান নাগরিক চালিয়েছিল। টিটিপি এ হামলার দায় স্বীকার করে।

পাকিস্তানি তালেবান কারা
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান ২০০৭ সালে উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে সক্রিয় কয়েকটি জঙ্গি গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত হয়। এটি সাধারণভাবে পাকিস্তানি তালেবান নামে পরিচিত।
এই গোষ্ঠী বাজার, মসজিদ, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও পুলিশ স্টেশনে হামলা চালিয়েছে। তারা আফগানিস্তান সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় এবং পাকিস্তানের ভেতরেও, যেমন স্বাত উপত্যকায়, প্রভাব বিস্তার করেছিল। ২০১২ সালে তৎকালীন স্কুলছাত্রী মালালা ইউসুফজাইয়ের ওপর হামলার পেছনেও এই গোষ্ঠী ছিল। দুই বছর পর তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়েও টিটিপি আফগান তালেবানের সঙ্গে ছিল এবং পাকিস্তানে আফগান যোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছিল। পাকিস্তান নিজ ভূখণ্ডে টিটিপির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালালেও সাফল্য সীমিত ছিল। তবে ২০১৬ সালে শেষ হওয়া এক অভিযানে কয়েক বছর ধরে হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
)
এখন কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান তার সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারে। কাবুল পাল্টা হিসেবে সীমান্ত পোস্টে হামলা বা নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে সীমান্ত পেরিয়ে গেরিলা আক্রমণ বাড়াতে পারে।
সামরিক সক্ষমতার বিচারে দুই পক্ষের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার সদস্য নিয়ে তালেবান বাহিনী পাকিস্তানের সামরিক জনবলের এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
)
তালেবানদের অন্তত ছয়টি বিমান ও ২৩টি হেলিকপ্টার রয়েছে বলে জানা যায়, তবে সেগুলোর অবস্থা স্পষ্ট নয়। তাদের কোনো যুদ্ধবিমান বা কার্যকর বিমানবাহিনী নেই।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীতে সক্রিয় সদস্যের সংখ্যা ৬ লাখের বেশি। তাদের কাছে ছয় হাজারেরও বেশি সাঁজোয়া যুদ্ধযান ও ৪০০-র বেশি যুদ্ধবিমান রয়েছে। দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিতও।
সূত্র: রয়টার্স
লুসি ক্রেইমার, সাদ সাঈদ ও আসিফ শাহজাদ 



















