যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর চাপ কিউবার অর্থনীতিকে সম্ভাব্য ধসের মুখে ঠেলে দেওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বীপটির কমিউনিস্ট সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চান, যাতে বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায়—যদিও এতে তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্রদের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত নেতৃত্ব পরিবর্তন আপাতত স্থগিত রাখতে হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিচ্ছে, কিউবার কমিউনিস্ট নেতৃত্বের অবসান দাবি করলেও তারা ভিন্ন কৌশল নিতে পারে। এই পন্থা অনেকটা ভেনেজুয়েলায় তাঁর গ্রহণ করা নীতির মতো, যেখানে জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পরও দেশটির বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকে।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে নৌকায় করে কিউবার উপকূলে পৌঁছানোর সময় কিউবার সীমান্তরক্ষীরা চারজন কিউবান নাগরিককে গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনায় প্রভাব পড়বে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ভেনেজুয়েলায় বিরোধী নেতাদের ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানিয়ে বছর কাটানোর পর ট্রাম্প মাদুরোর উত্তরসূরির সঙ্গে সহযোগিতা করেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির তেলে প্রবেশাধিকার পায়। রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রশ্ন পরে তোলা হয়।
একইভাবে, ট্রাম্প হাভানায় হঠাৎ ক্ষমতার শূন্যতা চান না বলে প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর এক সহযোগী জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রুবিও নিজেও এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজনের মতে, রুবিও ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই রাউলের নাতি রাউল গিয়ের্মো রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে কথা বলেছেন।

লাতিন আমেরিকা নীতিতে ট্রাম্পের প্রধান মুখ রুবিও কিউবান অভিবাসীদের সন্তান এবং দীর্ঘদিন ধরে কিউবা সরকারের পতনের পক্ষে কথা বলেছেন। তবে বুধবার ক্যারিবীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁর সুর কিছুটা সংযত শোনা যায়। তিনি বলেন, কিউবার পরিবর্তন দরকার, তবে তা একদিনে বা হঠাৎ করে হতে হবে এমন নয়। তিনি ভেনেজুয়েলার উদাহরণ টেনে বলেন, পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ঘটতে পারে।
কিউবার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি টেকসই নয়—এ যুক্তি তুলে ধরে রুবিও ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে অর্থনৈতিক সংস্কারেই সন্তুষ্ট হতে পারে। তাঁর ভাষায়, যদি কিউবা নাটকীয় অর্থনৈতিক সংস্কার আনে এবং পরে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পথ খুলে দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তা স্বাগত জানাবে।
হঠাৎ রাজনৈতিক রূপান্তরের দাবির তুলনায় এই পন্থা হয়তো বেশি কার্যকর হতে পারে। কিউবা সরকার বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ দেখালেও সংবিধান বা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আলোচনায় বসবে না বলে জানিয়েছে।
)
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত থাকলেও কিউবার বিরুদ্ধে ট্রাম্প এমন হুমকি দেননি। আর মাদুরোকে আটক করার মতো অভিযান পুনরাবৃত্তি করা অত্যন্ত কঠিন।
হাভানায় গত সপ্তাহের বিদ্যুৎ বিভ্রাট কিউবার চলমান সংকটের প্রতীক। ভেনেজুয়েলা ও মেক্সিকোকে তেল সরবরাহ বন্ধে চাপ দিয়ে ট্রাম্প কিউবার অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছেন। প্রথমে মাদুরোকে আটক করার পর ভেনেজুয়েলাকে হাভানায় তেল পাঠানো বন্ধে বাধ্য করা হয়। এরপর ২৯ জানুয়ারি জারি করা এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যে দেশ কিউবাকে তেল বিক্রি বা সরবরাহ করবে, তাদের ওপর শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। কিউবার শেষ বড় সরবরাহকারী মেক্সিকোও আর তেল পাঠাচ্ছে না।
ফলে কিউবা কর্মঘণ্টা ও স্কুলের সময় কমিয়েছে এবং বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর জ্বালানি সরবরাহে অক্ষমতার কথা জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবের পর থেকে এটি কিউবা সরকারের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় হুমকি।
ওয়াশিংটন ও দক্ষিণ ফ্লোরিডায় কিউবা-নীতির কট্টর সমর্থকেরা দ্বীপটির সম্ভাব্য মুক্তির প্রত্যাশায় আছেন। মিয়ামি এলাকার রিপাবলিকান প্রতিনিধি মারিয়া এলভিরা সালাজার সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, কিউবার স্বাধীনতার দিন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কাছাকাছি।
রুবিওর সংযত ভাষা অনেক বিশ্লেষককে বিস্মিত করেছে, কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিউবা সরকারকে নির্মম একনায়কতন্ত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন। ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলে রুবিও তার কড়া সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, বেশি বাণিজ্য বা অর্থপ্রবাহ রাজনৈতিক স্বাধীনতা আনবে—এই ধারণা ভ্রান্ত। ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে এসে ওবামার নীতি উল্টে দেন।
রুবিও সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, ভেনেজুয়েলার ডেলসি রদ্রিগেজের মতো কিউবায় উপযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়েছে। রদ্রিগেজ মাদুরোর উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছেন। কিউবায় রদ্রিগেজ কাস্ত্রো, যিনি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উচ্চপদে আছেন এবং এল কাংগ্রেখো নামে পরিচিত, তাঁর সঙ্গে রুবিওর কথোপকথনের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর দাদা রাউল কাস্ত্রো ২০০৮ সালে ভাই ফিদেলের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা নেন। ২০১৮ সাল থেকে দেশটি প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেলের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে।

হাভানায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক মাইক হ্যামার স্প্যানিশ দৈনিক এবিসিকে বলেন, কিউবার ব্যবস্থার ভেতরেই এমন কিছু ব্যক্তি আছেন, যারা মনে করেন বর্তমান প্রকল্পের সমাপ্তি ঘনিয়ে এসেছে এবং পরিবর্তনে আগ্রহী হতে পারেন।
কিউবা সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে মন্তব্য করেনি। দিয়াজ-কানেল বলেছেন, তিনি চাপ বা পূর্বশর্ত ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপে আগ্রহী। তবে তিনি কাস্ত্রো পরিবারের কমিউনিস্ট ব্যবস্থাকে রক্ষার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাঁর ভাষায়, কিউবা নতজানু হয় না।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, কিউবায় ভেনেজুয়েলার মতো কোনো সমঝোতার অংশীদার খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রায় সাত দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা কিউবার কমিউনিস্ট নেতৃত্বের শিকড় অনেক গভীর। রাজনৈতিক বিরোধী শক্তি কার্যত নেই; অনেকে কারাগারে বা নির্বাসনে।
তবু ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা বিশ্বাস করেন, অর্থনৈতিক ধস ও সম্ভাব্য সহিংস বিদ্রোহের ঝুঁকি এড়াতে কিউবার নেতাদের ছাড় দিতে হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিট এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কিউবা একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও সমৃদ্ধ গণতন্ত্র হওয়া উচিত। তাঁর দাবি, বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং দেশ ধসে যাচ্ছে; তাই দ্রুত বড় পরিবর্তন আনা তাদের স্বার্থেই।

ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ জেসন মারচাক বলেন, কিউবায় কমিউনিস্ট শাসন থেকে সরে আসা অত্যন্ত কঠিন হবে, কারণ অধিকাংশ কিউবান কখনো অন্য শাসনব্যবস্থা দেখেননি। তবে তিনি মনে করেন, ভেনেজুয়েলার তুলনায় কিউবার ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খল রূপান্তরের ঝুঁকি ট্রাম্প ও রুবিও হয়তো বেশি নিতে রাজি হতে পারেন, কারণ কিউবার অর্থনীতি বিচ্ছিন্ন এবং রপ্তানি সীমিত।
গণঅভিবাসনের ঝুঁকি মানবিক সহায়তার মাধ্যমে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে স্থানীয় ক্যাথলিক চার্চের সহায়তায় কিছু ত্রাণ পাঠানো শুরু করেছে।
এ ধরনের আশঙ্কা নতুন নয়। অতীতে কিউবার অর্থনৈতিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাতীয় গোয়েন্দা মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছিল, সরকার পতন ঘটলে জটিল ও নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। তাতে সহিংসতা, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, বড় আকারের অভিবাসন এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার দাবি উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
তবে সেই নথি এটিও স্মরণ করিয়ে দেয়, কিউবার পতনের বহু পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৯৩ সালের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই ফিদেল কাস্ত্রোর সরকার পতনের সম্ভাবনা অর্ধেকের বেশি। বাস্তবে তা ঘটেনি।
মাইকেল ক্রাউলি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রতিবেদন করেন। তিনি প্রায় তিন ডজন দেশের অভিজ্ঞ প্রতিবেদক এবং প্রায়ই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ভ্রমণ করেন।

মাইকেল ক্রাউলি 


















