কিউবার জলসীমায় একটি চুরি হওয়া স্পিডবোটে আসা একদল সশস্ত্র ব্যক্তির সঙ্গে কোস্ট গার্ডের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর রহস্য। কিউবা সরকার একে সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশের চেষ্টা বললেও, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত এক ব্যক্তির নাম ভুলভাবে জড়িয়ে পড়ায় সরকারি বর্ণনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনার সূচনা: চুরি হওয়া নৌযান ও অভিযানের দাবি
কিউবা সরকারের দাবি, ফ্লোরিডায় নিবন্ধিত একটি স্পিডবোটে করে ১০ জন কিউবান নাগরিক যুক্তরাষ্ট্র থেকে রওনা হয়ে বুধবার কিউবার জলসীমায় প্রবেশ করে। তাদের কাছে ছিল স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, পিস্তল, ঘরে তৈরি বিস্ফোরক, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, টেলিস্কোপিক সাইট ও ছদ্মবেশী পোশাক। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্যে অনুপ্রবেশ।
সরকার আরও জানায়, নৌযানটি কোস্ট গার্ডের টহল জাহাজের ওপর গুলি চালায়। পাল্টা গোলাগুলিতে চারজন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়।
তবে ঘটনার পরদিনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় নানা প্রশ্ন সামনে আসে। তারা কি স্বতন্ত্র চরমপন্থী, নাকি রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এটি কোনো পরিকল্পিত ফাঁদ—তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।

ভুল পরিচয় ও সরকারি ব্যাখ্যা
প্রথমদিকে জীবিতদের একজন হিসেবে রবার্তো আজকোরা কনসুয়েগ্রা নামের এক কর্মীর নাম প্রকাশ করা হয়। কিন্তু তিনি তখন মিয়ামিতে অবস্থান করছিলেন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। পরে কিউবার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্লোস ফার্নান্দেস দে কসিও এ তথ্যকে ভুল বলে স্বীকার করেন।
আজকোরা দাবি করেন, তার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া কাকতালীয় নয়। তার মতে, কর্তৃপক্ষ হয়তো ধারণা করেছিল তিনি ওই নৌযানে থাকবেন। তিনি নিজেকে কিউবার দীর্ঘদিনের কমিউনিস্ট সরকারের বিরোধী কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। কিউবা সরকার তাকে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার ইতিহাস আছে বলে অভিযোগ করেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক উত্তেজনা
কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতার ইতিহাস রয়েছে। অতীতে নির্বাসিত কিউবান গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কিউবা সরকার সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছে। ১৯৯৬ সালে নির্বাসিত একটি সংগঠনের বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায়ও গোয়েন্দা অনুপ্রবেশের তথ্য সামনে এসেছিল।
বর্তমান ঘটনাটি ঘটেছে এমন সময়ে, যখন দুই দেশের সম্পর্ক চরম উত্তেজনাপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন কিউবার জ্বালানি আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে দেশটি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
নিহত ও আটক ব্যক্তিদের পরিচয়
কিউবা সরকার জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে আমিজাইল সানচেজ গনসালেস, লেওর্দান ক্রুজ গোমেজ, কনরাডো গালিনদো সারিওল, হোসে ম্যানুয়েল রদ্রিগেজ কাস্তেলো, রবার্তো আলভারেজ আভিলা ও ক্রিস্টিয়ান আকোস্তা গুয়েভারা রয়েছেন। আরেক ব্যক্তি আগে থেকেই কিউবায় পৌঁছেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে

নিহত চারজন হলেন পাভেল আলিং পেনা, মিশেল ওর্তেগা কাসানোভা, হেক্টর ক্রুজ কোরেয়া ও লেদিয়ান পাদ্রোন গুয়েভারা। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, নিহতদের মধ্যে অন্তত দুজন মার্কিন নাগরিক ছিলেন।
চুরি হওয়া নৌযানের রহস্য
১৯৮১ সালের তৈরি ২৪ ফুটের একটি নৌযান ফ্লোরিডা কিজ এলাকা থেকে চুরি হয় বলে মনরো কাউন্টি শেরিফের দপ্তর জানিয়েছে। নৌযানের মালিক প্রথমে ভেবেছিলেন তার এক কর্মচারী অনুমতি ছাড়াই এটি নিয়ে গেছেন। পরে সংবাদে নৌযানের নিবন্ধন নম্বর দেখে তিনি পুলিশকে জানান। সন্দেহভাজন হিসেবে হেক্টর ক্রুজ কোরেয়ার নাম উঠে আসে, যিনি পরে নিহতদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া ও সন্দেহ
আহতদের একজন কনরাডো গালিনদো মিয়ামি থেকে রওনা হওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেননি বলে তার স্ত্রী জানান। তিনি দাবি করেন, তার স্বামী অস্ত্র ব্যবহার করতেন না এবং ঘটনার বর্ণনা কতটা সত্য তা তিনি জানেন না।
গালিনদো অতীতে কিউবায় কারাবন্দি ছিলেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তিনি একাধিকবার একটি রেডিও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কিউবার সরকারের বিরোধিতা করেছিলেন।
আরেকজন আটক ব্যক্তি সানচেজ গনসালেসের বিরুদ্ধে অতীতে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সরকারি তদন্ত ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল বলেছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কিউবা দৃঢ় অবস্থানে থাকবে। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও বিষয়টি স্পষ্ট করতে সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ নতুন করে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযান, নাকি বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ—তার স্পষ্ট উত্তর এখনও অজানা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















