আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল ও তালেবান নেতৃত্বের ঘাঁটি কান্দাহারে পাকিস্তানের সরাসরি বিমান ও স্থল হামলার পর দুই দেশের সম্পর্ক চরম সংঘাতে গড়িয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে ‘খোলাখুলি যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সীমান্তজুড়ে গোলাগুলি, পরস্পরবিরোধী ক্ষয়ক্ষতির দাবি এবং প্রতিশোধের হুঁশিয়ারিতে অঞ্চলজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংঘাতের নতুন মোড়
শুক্রবার পাকিস্তান কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে বিমান থেকে ভূমিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, তালেবানের সামরিক দপ্তর ও চৌকিগুলো ছিল লক্ষ্যবস্তু। সীমান্তের একাধিক সেক্টরে স্থল সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
তালেবানের দাবি, তারা পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হেনেছে। এটি প্রথমবার, যখন ইসলামাবাদ সরাসরি তালেবান স্থাপনায় হামলা চালাল। এতদিন পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছিল, আফগান ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া জঙ্গিরা সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালায়। তালেবান সেই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা সমস্যা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
![]()
‘ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে’
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাওয়াজা মুহাম্মদ আসিফ বলেছেন, “আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন এটি খোলাখুলি যুদ্ধ।” তার বক্তব্য দুই দেশের কূটনৈতিক দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে।
তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ নিশ্চিত করেছেন, কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ার বিভিন্ন অংশে পাকিস্তানি বাহিনী বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে তিনি বিস্তারিত তথ্য দেননি। কান্দাহার তালেবানের প্রধান কার্যালয় এবং সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার অবস্থানস্থল হিসেবে পরিচিত।
কাবুলে আতঙ্কের রাত
কাবুলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গভীর রাতে যুদ্ধবিমান উড়ে এসে অন্তত দুটি স্থানে বোমা নিক্ষেপ করে। আকাশে আগুনের ঝলকানি ও বিকট বিস্ফোরণের শব্দে বাসিন্দাদের ঘুম ভেঙে যায়। একটি অস্ত্রগুদামে আগুন ধরে গেলে ভেতরের গোলাবারুদ একের পর এক বিস্ফোরিত হতে থাকে। শহরজুড়ে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা যায়।
একজন ট্যাক্সিচালক জানান, তিনি প্রথমে বিমানের শব্দে জেগে ওঠেন, এরপর পরপর বিস্ফোরণ ঘটে। আতঙ্কে অনেকে বাড়ির নিচতলায় আশ্রয় নেন।

ক্ষয়ক্ষতির বিপরীত হিসাব
পাকিস্তানের দাবি, তাদের অভিযানে ১৩৩ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত ও দুই শতাধিক আহত হয়েছে। বহু চৌকি ধ্বংস বা দখল করা হয়েছে বলেও তারা জানায়।
পাল্টা তালেবান দাবি করেছে, ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং একাধিক চৌকি তাদের নিয়ন্ত্রণে গেছে। তাদের আট যোদ্ধা নিহত, ১১ জন আহত এবং নানগরহার প্রদেশে ১৩ বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
দীর্ঘ সীমান্ত, দীর্ঘ সংঘাতের আশঙ্কা
দুই দেশের মধ্যে প্রায় দুই হাজার ছয়শ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। অতীতেও সংঘর্ষে বহু সেনা নিহত হয়েছে। পরে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় উত্তেজনা কিছুটা কমে আসে।
তবে এবারের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও তালেবান গেরিলা কৌশলে অভিজ্ঞ। ফলে সীমান্তজুড়ে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা
রাশিয়া সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়ে প্রয়োজনে মধ্যস্থতার ইঙ্গিত দিয়েছে। চীন জানিয়েছে, তারা নিজস্ব কূটনৈতিক চ্যানেলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছে এবং উত্তেজনা বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
জাতিসংঘ আগের হামলায় বেসামরিক হতাহতের বিষয় উল্লেখ করে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
উচ্চ সতর্কতায় পাকিস্তান
সপ্তাহজুড়ে পাকিস্তান উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। পূর্ব আফগানিস্তানে জঙ্গি শিবিরে আগের হামলার পর থেকেই উত্তেজনা বাড়ছিল। পাঞ্জাব প্রদেশে সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বহু আফগান নাগরিককে আটক করে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
এদিকে আফগানিস্তানের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম আত্মঘাতী হামলাকারীদের একটি ব্যাটালিয়ন প্রস্তুত থাকার দাবি করেছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, বড় শহরগুলোতে জঙ্গি হামলা বাড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে দুই প্রতিবেশীর সংঘাত সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে—এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















