পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ দুটি প্রধান শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে। কয়েক মাসের সীমান্ত উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি গোলাগুলির পর এই হামলাকে দুই দেশের মধ্যে ‘খোলাখুলি যুদ্ধ’-এর সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে আফগান বাহিনী পাকিস্তানের সীমান্ত চৌকিতে আক্রমণ চালিয়েছিল বলে উভয় দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ায় হামলা
তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, কাবুলের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের কান্দাহার এবং সীমান্তবর্তী পাকতিয়া প্রদেশেও হামলা হয়েছে। কান্দাহার শহরটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা শেখ হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা অবস্থান করেন।
একজন আফগান সামরিক কর্মকর্তা জানান, কাবুলে অন্তত একটি গোলাবারুদের গুদামে বোমা ফেলা হয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও কান্দাহারে একটি অস্ত্রভান্ডারে হামলার কথা নিশ্চিত করেছে।

সীমান্ত হামলার জবাব ও ‘ধৈর্যের বাঁধ ভাঙা’ মন্তব্য
আফগান ও পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আফগান বাহিনী পাকিস্তানের সীমান্ত পোস্টে হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান এই বিমান হামলা শুরু করে। আফগান পক্ষ বলছে, এটি ছিল সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানের আগের হামলার জবাব।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাওয়াজা আসিফ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন এটি আমাদের মধ্যে খোলাখুলি যুদ্ধ।”
পাকিস্তানি তালেবান ইস্যুতে দীর্ঘদিনের বিরোধ
দুই দেশের সম্পর্ক অবনতির মূল কারণ পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার পাকিস্তানি তালেবানকে আশ্রয় দিচ্ছে। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান নামের এই গোষ্ঠী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। গত শরতে ইসলামাবাদের একটি আদালতে আত্মঘাতী হামলায় ডজনখানেক মানুষ নিহত হয়, যার দায় স্বীকার করেছিল এই গোষ্ঠী।
পাকিস্তানের দাবি, আফগান ভূখণ্ডে তারা প্রশিক্ষণ ও সংগঠনের সুযোগ পায় এবং সেখান থেকেই প্রায় ১,৬০০ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালায়। তবে তালেবান সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, পাকিস্তান নিজের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় এড়াতে আফগানিস্তানকে দোষারোপ করছে।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও জাতিসংঘের প্রতিবেদন
বেসরকারিভাবে কিছু আফগান কর্মকর্তা পাকিস্তানি তালেবানের উপস্থিতি স্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়াও আফগানিস্তানে সক্রিয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগান প্রশাসন পাকিস্তানি তালেবানকে রাইফেল ও ড্রোনসহ বিভিন্ন অস্ত্র সরবরাহ করেছে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আল-কায়েদাও তালেবান নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে পাকিস্তানি তালেবান প্রায় ৩০০টি হামলায় ৪৪০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে। নিহতদের ৮০ শতাংশের বেশি ছিলেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
সীমান্তে হতাহতের পাল্টাপাল্টি দাবি
শুক্রবারের সীমান্ত সংঘর্ষে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা অন্তত ১৩৩ জন আফগান যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে তালেবান মুখপাত্র জানিয়েছেন, ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। স্বাধীনভাবে এসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রমজানে শান্তির আশা ভঙ্গ
পবিত্র রমজান মাসে জাতিসংঘ আশা করেছিল, দুই দেশ সংযম প্রদর্শন করবে। কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবর মাসে একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিন্তু ঘন ঘন সীমান্ত সংঘর্ষ সেই সমঝোতাকে দুর্বল করে দেয়।
সম্পর্কের নাটকীয় পরিবর্তন
একসময় পাকিস্তান তালেবানকে নীরব সমর্থন দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আফগান যুদ্ধের সময় তালেবান নেতৃত্ব দক্ষিণ পাকিস্তানে অবস্থান করত। ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তান প্রথমে তাদের সঙ্গে সমঝোতার পথেই ছিল। এমনকি আফগানিস্তানকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরে যুক্ত করার কথাও আলোচনায় ছিল।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেছে। পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “এটি কোনো সরকার নয়, তারা যুদ্ধপ্রধানদের একটি গোষ্ঠী। আফগানিস্তান এখন এমন এক জায়গা, যেখানে একটি অরাষ্ট্রীয় মিলিশিয়া ক্ষমতায় বসে আছে।”
মধ্যস্থতায় ইরানের প্রস্তাব
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ইরান মধ্যস্থতায় প্রস্তুত। তিনি সামাজিক মাধ্যমে উল্লেখ করেন, রমজান সংযম ও সংহতির মাস, এই সময়ে সংলাপের মাধ্যমে প্রতিবেশীসুলভ আচরণ বজায় রেখে বিরোধ মেটানো উচিত।
দুই দেশের মধ্যে চলমান এই সংঘাত শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলেরও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















