আমেরিকার যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান উপসাগরীয় উপকূলে জড়ো হওয়ার পরও ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি ও অস্ত্রনীতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এই অবস্থান ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের বিস্মিত করলেও তেহরানের ক্ষমতাসীন ধর্মীয় নেতৃত্ব মনে করছে, ছাড় দেওয়া তাদের আদর্শ ও সার্বভৌমত্বের জন্য যুদ্ধের চেয়েও বড় হুমকি হতে পারে।
যুদ্ধের চেয়ে শর্ত মানা বেশি বিপজ্জনক?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দৃষ্টিভঙ্গির এই বিপজ্জনক অমিলই আলোচনাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। ফলে নতুন আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। তেহরানের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, রাষ্ট্রের আদর্শিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক ভূমিকা কখনও কখনও তাৎক্ষণিক টিকে থাকার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানকে শূন্য মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে রাজি হতে হবে, যাতে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার কথাও বলা হচ্ছে।
কিন্তু ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সমৃদ্ধকরণকে দেশের অধিকার হিসেবে দেখেন। একই সঙ্গে ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রকে আত্মরক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে মনে করে তেহরান।
জেনেভা বৈঠক ও শেষ মুহূর্তের কূটনীতি
উভয় পক্ষ জেনেভায় বৈঠকে বসার প্রস্তুতি নিয়েছে, যা অনেকের চোখে যুদ্ধ এড়ানোর শেষ চেষ্টা। আলোচনায় এমন একটি প্রস্তাব বিবেচনায় আসতে পারে, যেখানে বেসামরিক উদ্দেশ্যে সীমিত মাত্রায় সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে ইরান।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি অংশ মনে করে, সাম্প্রতিক সামরিক আঘাত ও কঠোর নিষেধাজ্ঞায় ইরান এতটাই দুর্বল হয়েছে যে এখন তাদের শর্ত মেনে নেওয়া উচিত। গত জুনে ইসরায়েলের নেতৃত্বে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন এবং পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ক্ষতি হয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা যুক্ত হয়ে অর্থনীতি আরও সংকটে পড়ে।

অভ্যন্তরীণ চাপ ও সামরিক ঘেরাও
জানুয়ারিতে খামেনির পদত্যাগ দাবিতে হওয়া বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়। তবুও মাঝেমধ্যে ছোট আকারে প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে, যা শাসকদের প্রতি জনঅসন্তোষের ইঙ্গিত দেয়।
এর পাশাপাশি পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী রণতরী আঘাতকারী দল এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নজরদারি ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান মোতায়েন পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।

তেহরানের আশঙ্কা ও প্রতিরোধের কৌশল
ইরানের নেতৃত্বের বিশ্বাস, ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন। তাই তারা মনে করে, একবার নতি স্বীকার করলে চাপ আরও বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান চাইলে হরমুজ প্রণালী বা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে তা মার্কিন রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে নির্বাচনের বছরে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দ্রুত ও বিধ্বংসী হামলা চালাতে সক্ষম, যার উদাহরণ গত বছরের সংঘাতে দেখা গেছে। তবুও তেহরান আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নেতৃত্ব কাঠামোতে একাধিক স্তর তৈরি করেছে, যাতে শীর্ষ পর্যায়ে ক্ষতি হলেও নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।
সামনে কোন পথ?
প্রশ্ন হচ্ছে, সম্ভাব্য মার্কিন হামলা কি কেবল আলোচনায় ফেরানোর কৌশল, নাকি তা ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা হবে? আর ইরান কতটা পাল্টা আঘাত হানতে পারবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি যুদ্ধ ইরানকে আরও নমনীয় করবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং টিকে থাকলে তেহরান আবারও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। ফলে সমঝোতা না হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতা প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















