০৮:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
পাকিস্তানের পাল্টা অভিযানে ২৭৪ তালেবান সদস্য ও জঙ্গি নিহত: আইএসপিআর প্রধান ইউরোপ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পথে প্রস্তুত, কিন্তু তার মূল্য কত? দক্ষিণী সিনেমার মহীরুহ বি. নাগি রেড্ডি: আলোর আড়ালের এক নির্মাতার অজানা জীবনকথা গার্মেন্টস শ্রমিকদের বকেয়া ও চাকরিচ্যুতি নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন মার্কেলের সতর্কবার্তা: সুরক্ষাবাদে থমকে যাচ্ছে প্রবৃদ্ধি, বহুপাক্ষিকতার পথেই সমাধান পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়ার আত্মবিশ্বাস শাহর, সীমান্ত ঘেরাটোপ ও অনুপ্রবেশ রুখতেই প্রধান লক্ষ্য ভারতে অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবই নিষিদ্ধ, সব কপি জব্দের নির্দেশ; বিচারব্যবস্থাকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ দেখানোর অভিযোগে শীর্ষ আদালতের কড়া অবস্থান রমজানের ইফতারে বৈচিত্র্য আনতে ৮ সহজ রেসিপি, স্বাদে-স্বাস্থ্যে পরিপূর্ণ আয়োজন পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতা ভারতের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত: ইজরায়েলে মোদির কূটনৈতিক বার্তা ৩ মার্চ, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যাবে ব্লাড মুন 

আফগানিস্তানের হাইওয়ে ১: যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে নিরাপত্তার পথে, তবু কর্মসংস্থানের হাহাকার

কাবুল থেকে কান্দাহার—প্রায় ৩০০ মাইলের দীর্ঘ পথ। এক সময় এই সড়ক ছিল আফগানিস্তানের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও বিধ্বস্ত রাস্তাগুলোর একটি। বোমার গর্ত, যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ আর অবরুদ্ধ যাত্রা ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। এখন সেই হাইওয়ে ১ নতুন চেহারায় দাঁড়িয়ে। মসৃণ সড়ক, কড়া নিরাপত্তা আর নিয়মতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে বদলে গেছে যাত্রার অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই দৃশ্যমান উন্নতির আড়ালে রয়ে গেছে কাজের অভাব আর গভীর অর্থনৈতিক সংকটের প্রশ্ন।

যুদ্ধ থেকে নিয়ন্ত্রণে

২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর হাইওয়ে ১–কে তারা অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ধরে। একসময় ১৮ ঘণ্টা লেগে যেত কাবুল-কান্দাহার পথ পাড়ি দিতে, এখন সময় কমে হয়েছে প্রায় ৮ ঘণ্টা। রাস্তার গর্ত মেরামত, নতুন করে পিচ ঢালা, ভারী ট্রাকের ওজন নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে যাত্রা হয়েছে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক।

পথের ধারে এখন ঝকঝকে জ্বালানি কেন্দ্র, বাদাম ও শুকনো ফলের দোকান, ছোট খাবারের স্টল। অনেক ব্যবসা আবার চালু হয়েছে। সূর্যাস্তের আলোয় কবুতর ওড়ানোর দৃশ্য কিংবা মসজিদের সামনে মানুষের আনাগোনা—সব মিলিয়ে এক ধরনের স্থিতিশীলতার ছবি ফুটে ওঠে।

A person on a flat concrete roof of a building holds a cloth, with several birds flying nearby. Mountains are visible in the distance.

অর্থনীতির আংশিক ঘুরে দাঁড়ানো

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরে আফগান অর্থনীতি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। তালেবান প্রশাসন এটিকে তাদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। তারা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করছে এই উন্নয়নের চিত্র দেখিয়ে।

কান্দাহারের এক মোবাইল ফোন দোকানদার ইকবাল নূরির ভাষায়, আগের সরকারের ভারী অস্ত্র আর বিপুল অর্থেও স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি। এখন মানুষ নিরাপত্তাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে, কারণ বিকল্প নেই।

নারী অধিকার ও অর্থনৈতিক ক্ষতি

তবে এই চিত্রের অন্য দিকও রয়েছে। পুরো যাত্রাপথে নারীদের উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য। কর্মক্ষেত্র, মাধ্যমিকের পর শিক্ষা, দূরপাল্লার ভ্রমণ—সব ক্ষেত্রেই নারীদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ। বিশ্বব্যাংকের ধারণা, এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ১৪০ কোটি ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।

অর্থাৎ নিরাপত্তা বাড়লেও দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী কার্যত জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

A large, dirt-covered outdoor area with buses, cars, and many people.

নিরাপত্তা আছে, কাজ নেই

হাইওয়ে ১–এর ধারে যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে—ট্রাকচালক, ফল বিক্রেতা, মাংস ব্যবসায়ী, কাঠমিস্ত্রি—তারা সবাই নিরাপত্তার উন্নতি স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাদের বড় অভিযোগ, কাজের সুযোগ কমে গেছে।

গজনি প্রদেশের এক কাঠমিস্ত্রি নূর আগা রহমানি বলেন, আগে নিরাপত্তা ছিল না, কিন্তু কাজ ছিল। এখন নিরাপত্তা আছে, কাজ নেই। তরুণরা ঘরে বসে আছে, কারখানা দরকার, শিল্প দরকার।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে সড়কের উন্নতি সাধারণ মানুষের জীবনমান পুরোপুরি বদলে দিতে পারেনি।

যুদ্ধের ক্ষত এখনো দৃশ্যমান

কাবুলের দিকে এগোতে গেলে পথের ধারে ভেঙে পড়া সামরিক ঘাঁটি আর পরিত্যক্ত বাড়ির সারি চোখে পড়ে। কিছু গ্রামে শত শত বাড়ির মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি বসতিই টিকে আছে। যুদ্ধ শেষ হলেও অনেক এলাকায় শান্তির নীরবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবহেলার নিস্তব্ধতা।

A child in a patterned vest and cap smiles, holding a shovel in a dirt mound, next to a road and a small shop with colorful lights.

এক সাবেক তালেবান যোদ্ধা গুল রহমান হিমায়তের কথায়, যুদ্ধ তাদের পরিবার কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তখন অন্তত একটি উদ্দেশ্য ছিল। এখন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হলেও সাধারণ যোদ্ধাদের জন্য তেমন কিছু নেই।

উন্নয়নের প্রলেপ কতটা গভীর

পাহাড়ের ওপর থেকে হাইওয়ে ১ দেখতে অনেকটা শুষ্ক প্রান্তরের মধ্যে একা বয়ে যাওয়া সরু সাপের মতো। কৃষকেরা বলছেন, খরা আর দূষিত ভূগর্ভস্থ পানির কারণে জমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ চকচকে পিচঢালা সড়ক হয়তো উন্নয়নের প্রতীক, কিন্তু বাস্তবতার গভীরে সংকট এখনো জটিল।

হাইওয়ে ১ আজ নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু কর্মসংস্থান, নারী অধিকার এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে এই অগ্রগতি কতটা স্থায়ী হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

 

পাকিস্তানের পাল্টা অভিযানে ২৭৪ তালেবান সদস্য ও জঙ্গি নিহত: আইএসপিআর প্রধান

আফগানিস্তানের হাইওয়ে ১: যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে নিরাপত্তার পথে, তবু কর্মসংস্থানের হাহাকার

০৬:৩৭:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কাবুল থেকে কান্দাহার—প্রায় ৩০০ মাইলের দীর্ঘ পথ। এক সময় এই সড়ক ছিল আফগানিস্তানের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও বিধ্বস্ত রাস্তাগুলোর একটি। বোমার গর্ত, যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ আর অবরুদ্ধ যাত্রা ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। এখন সেই হাইওয়ে ১ নতুন চেহারায় দাঁড়িয়ে। মসৃণ সড়ক, কড়া নিরাপত্তা আর নিয়মতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে বদলে গেছে যাত্রার অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই দৃশ্যমান উন্নতির আড়ালে রয়ে গেছে কাজের অভাব আর গভীর অর্থনৈতিক সংকটের প্রশ্ন।

যুদ্ধ থেকে নিয়ন্ত্রণে

২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর হাইওয়ে ১–কে তারা অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ধরে। একসময় ১৮ ঘণ্টা লেগে যেত কাবুল-কান্দাহার পথ পাড়ি দিতে, এখন সময় কমে হয়েছে প্রায় ৮ ঘণ্টা। রাস্তার গর্ত মেরামত, নতুন করে পিচ ঢালা, ভারী ট্রাকের ওজন নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে যাত্রা হয়েছে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক।

পথের ধারে এখন ঝকঝকে জ্বালানি কেন্দ্র, বাদাম ও শুকনো ফলের দোকান, ছোট খাবারের স্টল। অনেক ব্যবসা আবার চালু হয়েছে। সূর্যাস্তের আলোয় কবুতর ওড়ানোর দৃশ্য কিংবা মসজিদের সামনে মানুষের আনাগোনা—সব মিলিয়ে এক ধরনের স্থিতিশীলতার ছবি ফুটে ওঠে।

A person on a flat concrete roof of a building holds a cloth, with several birds flying nearby. Mountains are visible in the distance.

অর্থনীতির আংশিক ঘুরে দাঁড়ানো

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরে আফগান অর্থনীতি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। তালেবান প্রশাসন এটিকে তাদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। তারা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করছে এই উন্নয়নের চিত্র দেখিয়ে।

কান্দাহারের এক মোবাইল ফোন দোকানদার ইকবাল নূরির ভাষায়, আগের সরকারের ভারী অস্ত্র আর বিপুল অর্থেও স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি। এখন মানুষ নিরাপত্তাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে, কারণ বিকল্প নেই।

নারী অধিকার ও অর্থনৈতিক ক্ষতি

তবে এই চিত্রের অন্য দিকও রয়েছে। পুরো যাত্রাপথে নারীদের উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য। কর্মক্ষেত্র, মাধ্যমিকের পর শিক্ষা, দূরপাল্লার ভ্রমণ—সব ক্ষেত্রেই নারীদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ। বিশ্বব্যাংকের ধারণা, এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ১৪০ কোটি ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।

অর্থাৎ নিরাপত্তা বাড়লেও দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী কার্যত জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

A large, dirt-covered outdoor area with buses, cars, and many people.

নিরাপত্তা আছে, কাজ নেই

হাইওয়ে ১–এর ধারে যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে—ট্রাকচালক, ফল বিক্রেতা, মাংস ব্যবসায়ী, কাঠমিস্ত্রি—তারা সবাই নিরাপত্তার উন্নতি স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাদের বড় অভিযোগ, কাজের সুযোগ কমে গেছে।

গজনি প্রদেশের এক কাঠমিস্ত্রি নূর আগা রহমানি বলেন, আগে নিরাপত্তা ছিল না, কিন্তু কাজ ছিল। এখন নিরাপত্তা আছে, কাজ নেই। তরুণরা ঘরে বসে আছে, কারখানা দরকার, শিল্প দরকার।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে সড়কের উন্নতি সাধারণ মানুষের জীবনমান পুরোপুরি বদলে দিতে পারেনি।

যুদ্ধের ক্ষত এখনো দৃশ্যমান

কাবুলের দিকে এগোতে গেলে পথের ধারে ভেঙে পড়া সামরিক ঘাঁটি আর পরিত্যক্ত বাড়ির সারি চোখে পড়ে। কিছু গ্রামে শত শত বাড়ির মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি বসতিই টিকে আছে। যুদ্ধ শেষ হলেও অনেক এলাকায় শান্তির নীরবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবহেলার নিস্তব্ধতা।

A child in a patterned vest and cap smiles, holding a shovel in a dirt mound, next to a road and a small shop with colorful lights.

এক সাবেক তালেবান যোদ্ধা গুল রহমান হিমায়তের কথায়, যুদ্ধ তাদের পরিবার কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তখন অন্তত একটি উদ্দেশ্য ছিল। এখন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হলেও সাধারণ যোদ্ধাদের জন্য তেমন কিছু নেই।

উন্নয়নের প্রলেপ কতটা গভীর

পাহাড়ের ওপর থেকে হাইওয়ে ১ দেখতে অনেকটা শুষ্ক প্রান্তরের মধ্যে একা বয়ে যাওয়া সরু সাপের মতো। কৃষকেরা বলছেন, খরা আর দূষিত ভূগর্ভস্থ পানির কারণে জমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ চকচকে পিচঢালা সড়ক হয়তো উন্নয়নের প্রতীক, কিন্তু বাস্তবতার গভীরে সংকট এখনো জটিল।

হাইওয়ে ১ আজ নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু কর্মসংস্থান, নারী অধিকার এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে এই অগ্রগতি কতটা স্থায়ী হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।