চীনের সামরিক বাহিনীতে নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে শীর্ষ পর্যায়ের অভিজ্ঞ জেনারেলদের সরিয়ে দেওয়ায় দেশটির যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কঠোর অভিযানে পিপলস লিবারেশন আর্মির উচ্চপদস্থ নেতৃত্বের বড় অংশ কার্যত শূন্য হয়ে পড়েছে, যা বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপকে জটিল করে তুলতে পারে।
শীর্ষ জেনারেলের পতন, অস্থিরতার নতুন অধ্যায়
গত মাসে চীনের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়াকে অপসারণের মাধ্যমে এই শুদ্ধি অভিযান নতুন মাত্রা পায়। গবেষকদের মতে, এটি কেবল প্রথম ধাপের সমাপ্তি; সামনে আরও অস্থিরতা অপেক্ষা করছে। ঝাংয়ের পতনের পর তার ঘনিষ্ঠ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চার বছরে শতাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা সরানো
গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় একশো জেনারেল ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা অপসারণ, বরখাস্ত বা আড়ালে চলে গেছেন। এমনকি অবসরের পরও অন্তত এগারোজন কর্মকর্তাকে শুদ্ধি অভিযানের আওতায় আনা হয়েছে। সামরিক বাহিনীর পাঁচটি থিয়েটার কমান্ডসহ কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোর নেতৃত্বে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালে একজন সিনিয়র কর্মকর্তার হঠাৎ অন্তর্ধান দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় চৌদ্দ জনে, ২০২৪ সালে আরও এগারো জন এবং গত বছরে প্রায় বাষট্টি জনকে সরানো হয়। চলতি বছরেও অন্তত এগারো জন কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অনুপস্থিত, যা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা বাড়াচ্ছে।
তাইওয়ান ফ্রন্টে প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, শীর্ষ পর্যায়ে এত বড় শূন্যতা থাকলে স্বল্পমেয়াদে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে বড় আকারের সামরিক অভিযান চালানো চীনের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে। ২০২৫ সালে তাইওয়ান ঘিরে সামরিক মহড়াগুলোর ওপরও এই শুদ্ধি অভিযানের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। কিছু মহড়া কমানো, বিলম্বিত বা সরলীকৃত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যোগ্যতা ও আনুগত্যের দ্বন্দ্ব
শি জিনপিংয়ের লক্ষ্য ছিল সামরিক বাহিনীতে দল ও নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য নিশ্চিত করা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আনুগত্য নয়, আধুনিক যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। বিপুলসংখ্যক অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ায় উপযুক্ত বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, পদোন্নতির আগে একজন কর্মকর্তাকে বর্তমান পদে তিন থেকে পাঁচ বছর কাজ করতে হয়। ফলে দ্রুত শূন্যপদ পূরণ করাও সহজ নয়।
যাদের সরানো হয়েছে, তাদের মধ্যে ছিলেন এমন এক জেনারেল যিনি তাইওয়ানমুখী বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন, একজন কর্মকর্তা যিনি সেনা প্রশিক্ষণ আধুনিকীকরণে ভূমিকা রেখেছিলেন এবং শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ সামরিক সহকারীও ছিলেন। তাদের পতন সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কাঠামোকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

নিয়োগে কড়া নজরদারি, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, এখন যেকোনো পদোন্নতি বা নিয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই হবে। এতে সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জট তৈরি হতে পারে। শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত নিম্নপদস্থ অসংখ্য কর্মকর্তার ক্যারিয়ারও অনিশ্চয়তায় পড়বে, যার প্রভাব অন্তত দুই থেকে তিন বছর স্থায়ী হতে পারে।
যদিও সামরিক আধুনিকীকরণের গতি আপাতত পুরোপুরি থেমে যায়নি, তবুও নেতৃত্ব সংকট ভবিষ্যৎ অভিযানে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। শি জিনপিং ইতিমধ্যে তাইওয়ান তদারকি করা কমান্ড ও বেইজিং সুরক্ষা দায়িত্বে নতুন কিছু নিয়োগ দিয়েছেন। তবে সর্বোচ্চ সামরিক নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনে নতুন নিয়োগ কবে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















