ভারতে অষ্টম শ্রেণির একটি সমাজবিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ে দেশের বিচারব্যবস্থাকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগে তা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে দেশটির শীর্ষ আদালত। শুধু নিষিদ্ধই নয়, বইটির মুদ্রিত ও ডিজিটাল—সব কপি অবিলম্বে জব্দ ও সিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আদালত অবমাননার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পাঠ্যবইয়ে ‘দুর্নীতি’ প্রসঙ্গকে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীদের মনে বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। বিচারপতিদের মতে, এটি ছিল সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ, যার প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাভাবনার ওপর পড়তে পারে।
স্বতঃপ্রণোদিত রিট, কঠোর মন্তব্য
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি আমলে নেয়। আদালতের ভাষ্য, পাঠ্যবইয়ে বাছাই করা কিছু উল্লেখের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থাকে একপেশেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বেঞ্চ জানায়, একটি পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে দেশের শীর্ষ আদালত ও উচ্চ আদালতগুলোর দীর্ঘদিনের গৌরবময় ভূমিকা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় তাদের অবদানকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে।

ক্ষমা প্রার্থনা, তবু থামছে না প্রক্রিয়া
সরকারের পক্ষে উপস্থিত আইন কর্মকর্তা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে জানান, বই প্রণয়নে যুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দায়িত্ব তাদের দেওয়া হবে না। তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, শুধু ক্ষমা প্রার্থনায় বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে না। দায়ীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত আদালত প্রক্রিয়া চলবে।
আদালত আরও জানিয়েছে, একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকলে প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন আপত্তি আদালতের
আদালতের মতে, সংশ্লিষ্ট পাঠ্যবইয়ে বিচারব্যবস্থার সাংবিধানিক ভূমিকা, মৌলিক কাঠামো রক্ষা, আইনি সহায়তা ব্যবস্থার উন্নয়ন কিংবা ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ—এসব গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষা করা হয়েছে। অথচ অতীতে দুর্নীতির অভিযোগে বহু উচ্চপদস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে আদালত নিজেই।
এই প্রেক্ষাপটে কেবল দুর্নীতির প্রসঙ্গকে গুরুত্ব দিয়ে বিচারব্যবস্থাকে উপস্থাপন করা প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে মন্তব্য করেন বিচারপতিরা।
শোকজ নোটিস ও আদালত অবমাননা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সচিব ও পাঠ্যবই প্রণয়ন সংস্থার প্রধানকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করেছে আদালত। বেঞ্চের বক্তব্য, আপত্তিকর অংশের ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তা সন্তোষজনকভাবে দেওয়া হয়নি; বরং বিষয়টি সমর্থনের চেষ্টা করা হয়েছে।
আদালত মনে করছে, এ ধরনের বিষয়বস্তু শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং শিক্ষক, অভিভাবক ও বৃহত্তর সমাজেও এর প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমালোচনার অধিকার অটুট
তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা বা জনস্বার্থে মতপ্রকাশ দমন করাই এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য নয়। গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে সমালোচনার অধিকার অক্ষুণ্ন রয়েছে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না বলে কড়া বার্তা দিয়েছে বেঞ্চ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















