পাকিস্তানের বিমান ও স্থল হামলায় কাবুল ও কান্দাহারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং প্রাণহানির পর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত। এক সময়ের মিত্র এখন মুখোমুখি সংঘাতে। তবে তীব্র এই সামরিক উত্তেজনার মাঝেই আলোচনায় বসতে আগ্রহ দেখিয়েছে আফগান তালেবান সরকার।
কাবুল ও কান্দাহারে বিস্ফোরণ, ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ
শুক্রবার ভোরে কাবুল ও কান্দাহারে একাধিক স্থানে পাকিস্তানের বিমান হামলা চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাজধানীর অন্তত দুটি স্থানে ঘন কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। একটি গোলাবারুদ ডিপোতে আগুন ধরে বিস্ফোরণ চলতেই থাকে দীর্ঘ সময়।
কাবুলের এক ট্যাক্সিচালক বলেন, রাতের নিস্তব্ধতায় হঠাৎ বিমান এসে দুই দফা বোমা ফেলে চলে যায়। এরপর শুরু হয় একের পর এক বিস্ফোরণ। আতঙ্কে মানুষ ঘর ছেড়ে নিচে নেমে আসে।
কান্দাহারেও হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল তালেবান নেতৃত্বের ঘাঁটি। এতে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন যে চরমে পৌঁছেছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

খোলা যুদ্ধের ঘোষণা, পরস্পরের পাল্টাপাল্টি দাবি
পাকিস্তান দাবি করেছে, আফগান ভূখণ্ডে জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগের জবাবেই এই হামলা। ইসলামাবাদ পরিস্থিতিকে ‘খোলা যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে তালেবান জানায়, তারা পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দিয়েছে। পাকিস্তান বলছে, সব ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে এবং বড় কোনো ক্ষতি হয়নি।
দুই পক্ষই ব্যাপক হতাহতের দাবি করেছে। পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা শতাধিক তালেবান যোদ্ধা ও কর্মকর্তা হত্যা করেছে। আফগানিস্তান বলছে, তাদের হামলায় বহু পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। তবে উভয় পক্ষের পরিসংখ্যান নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে।

সংলাপে আগ্রহ, কাতারের মধ্যস্থতার চেষ্টা
উত্তেজনার মাঝেই আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাতারের এক শীর্ষ কূটনীতিকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। তালেবান সরকার জানায়, তারা সহিংসতা চায় না এবং পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করতে চায়।
তবে তাদের শর্ত, অপর পক্ষকেও আন্তরিক ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ দেখাতে হবে। গত বছর দুই দেশের সংঘর্ষ থামাতে কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এবারও দোহা পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্রিয় হয়েছে বলে জানা গেছে।
সীমান্তজুড়ে গোলাগুলি, দীর্ঘ সংঘাতের আশঙ্কা
প্রায় দুই হাজার ছয়শ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে একাধিক স্থানে স্থলযুদ্ধের খবর পাওয়া গেছে। টোরখাম সীমান্তের কাছে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিলে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।
পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং সামরিক সক্ষমতায় আফগানিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তবে তালেবান গেরিলা যুদ্ধে অভিজ্ঞ, দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।
![]()
কাবুলে আতঙ্ক, নিরাপত্তা জোরদার
বিস্ফোরণের পর কাবুলজুড়ে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা যায়। পাকিস্তান নিজেদের পাঞ্জাব প্রদেশে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় নিরাপত্তা অভিযান চালানো হচ্ছে।
এর আগে পূর্ব আফগানিস্তানে জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাকিস্তানের হামলায় বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘও বেসামরিক মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। সেই ঘটনার জেরেই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সংকট এখন শুধু সীমান্ত সংঘর্ষ নয়, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন। আলোচনার পথ খোলা থাকলেও সামরিক উত্তেজনা যে কোনো সময় নতুন মাত্রা নিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















