গত এক দশকে জাপানে গাড়ির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে যন্ত্রাংশের খরচ বৃদ্ধি, পাশাপাশি নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় সংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে টয়োটা মোটরের জনপ্রিয় মডেল করোলার প্রারম্ভিক দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
দাম বৃদ্ধির পরিসংখ্যান
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কেই মিনিকার বা ছোট আকারের গাড়ির দাম ৩৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১৭ লাখ ৬০ হাজার ইয়েনে পৌঁছেছে। একই সময়ে কমপ্যাক্ট যাত্রীবাহী গাড়ির দাম ৩১ শতাংশ বেড়ে ২৩ লাখ ৯০ হাজার ইয়েন হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ আকারের যাত্রীবাহী গাড়ির দাম ২৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ লাখ ২০ হাজার ইয়েনে।
করোলার প্রারম্ভিক দাম ২০১৫ সালে ছিল ১৪ লাখ ৫০ হাজার ইয়েন, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ২২ লাখ ৮০ হাজার ইয়েন।

মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যবধান
এই সময়ে নিয়মিত কর্মীদের মজুরি বেড়েছে মাত্র ১০ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ গাড়ির দাম বৃদ্ধির হার মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি। ফলে অনেকের কাছেই নতুন গাড়ি কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণ
যন্ত্রাংশ, শ্রম ও কাঁচামালের খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা মানদণ্ড আরও কঠোর হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে ধাপে ধাপে স্বয়ংক্রিয় জরুরি ব্রেকিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সংক্রান্ত নতুন নিয়মের কারণে ইঞ্জিন ও এক্সহস্ট ব্যবস্থাও আরও জটিল হয়েছে।
এ ছাড়া চালক সহায়তা ব্যবস্থা ও বিনোদন সুবিধার মতো সফটওয়্যার নির্ভর ফিচার এখন প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় চিপ, ক্যামেরা ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি মডেল সংস্করণেই দাম বাড়ছে, যা অনেকটা স্মার্টফোন বাজারের ধারা অনুসরণ করছে।
ক্রেতাদের পছন্দে পরিবর্তন

ক্রেতাদের চাহিদার পরিবর্তনও গড় দাম বাড়াচ্ছে। বড় আকারের স্পোর্ট ইউটিলিটি যান ও মিনিভ্যানের চাহিদা বেড়েছে। ২০২৫ সালে পূর্ণাঙ্গ যাত্রীবাহী গাড়ির বিক্রি ১০ বছর আগের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। বিপরীতে কমপ্যাক্ট গাড়ির বিক্রি কমেছে ৪০ শতাংশ।
২০২৫ সালের শীর্ষ ১০ বিক্রিত নতুন গাড়ির তালিকায় আগের জনপ্রিয় কমপ্যাক্ট মডেলগুলো আর নেই। এর বদলে বিলাসবহুল মিনিভ্যান টয়োটার আলফার্ড এখন শীর্ষ তালিকায় উঠে এসেছে। আলফার্ডের প্রারম্ভিক দাম বর্তমানে ৫১ লাখ ইয়েন।
শীর্ষ ১০ মডেলের গড় প্রারম্ভিক দাম ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৭০ হাজার ইয়েন, যা ২০১৫ সালের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। এই তালিকার সাতটি মডেলের প্রারম্ভিক দাম ২০ লাখ ইয়েনের বেশি।
ব্যবহৃত গাড়ির বাজার ও মালিকানার খরচ
শুধু নতুন গাড়ি নয়, ব্যবহৃত গাড়ির দামও বেড়েছে। ২০১৫ সালে গড় ক্রয়মূল্য ছিল ১১ লাখ ৭০ হাজার ইয়েন, যা ২০২৩ সালে বেড়ে হয়েছে ১৭ লাখ ২০ হাজার ইয়েন।
গাড়ি মালিকানার খরচও বাড়ছে। পার্কিং ফি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক ব্যয় বাড়ছে। এ অবস্থায় বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরে অনেকেই গাড়ি কেনার বদলে কার শেয়ারিং সেবার দিকে ঝুঁকছেন। ২০২৫ সালে নতুন গাড়ির বিক্রি এক দশক আগের তুলনায় ১০ শতাংশ কমেছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে কার শেয়ারিং ব্যবহৃত গাড়ির সংখ্যা পাঁচ গুণেরও বেশি বেড়েছে।

ঋণ সুবিধা ও সুদের হার
জাপানে দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে অবশিষ্ট মূল্যভিত্তিক ঋণ জনপ্রিয় ছিল। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময় শেষে গাড়ি ডিলারের কাছে ফেরত দিলে সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে কিস্তি নির্ধারণ করা হয়। ফলে মাসিক কিস্তির চাপ কম থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে নিম্ন সুদের হার এই ব্যবস্থাকে সহায়ক করেছে।
তবে ২০২৪ সালের মার্চে প্রায় ১৭ বছর পর জাপানে নীতিগত সুদের হার বৃদ্ধি করা হয়। নিম্ন সুদের ওপর নির্ভরশীল অবশিষ্ট মূল্যভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থা কমে গেলে গাড়ি কেনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মত
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবর্তিত বাজার বাস্তবতায় গাড়ি নির্মাতাদের কেবল উৎপাদন নয়, পুরো শিল্পব্যবস্থার উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও গ্রাহক সেবাকে একত্রে বিবেচনা করে নতুন কৌশল গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















