মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং তার জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদন অঞ্চল থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের বাজার এখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে।
সংঘাতের সময়কালই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতির গভীরতা
বিশ্বে মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চল থেকে। তাই যুদ্ধ কতদিন গড়ায়, সেটিই ঠিক করবে ক্ষতির পরিমাণ। তবে এখনই হুমকি ও অনিশ্চয়তা বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের আগস্টের পর সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকদের ধারণা, দ্রুত সমাধান না এলে নতুন সপ্তাহের শুরুতেই দামে বড় উল্লম্ফন দেখা যেতে পারে।
হামলা, পাল্টা হামলা এবং বাড়তে থাকা উত্তেজনা
শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে। পাল্টা জবাবে উপসাগরীয় এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানের খারগ দ্বীপের কাছেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যেখান দিয়ে সাধারণত দেশটির অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়।
এখনও পর্যন্ত তেল ও গ্যাস স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির নিশ্চিত খবর মেলেনি। তবে শঙ্কা বাড়ছে, কারণ উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পরিবাহিত হয়। এই রুটে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়ছে আশঙ্কা
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। এখনো পুরোপুরি অবরোধের খবর না এলেও, ট্যাংকার আটকে পড়া বা হামলার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় অনেক তেল কোম্পানি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কয়েক দিনের জন্য পরিবহন স্থগিত রেখেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই সতর্কতা সহজে কাটবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই ট্যাংকার ভাড়ার হার বেড়ে গেছে। বছরের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনে যাওয়া বড় ট্যাংকারের ভাড়া তিন গুণের বেশি বেড়েছে। ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি জাহাজের সংকটও এর কারণ।

অতীতের অভিজ্ঞতা এবং সম্ভাব্য প্রভাব
ইতিহাস বলছে, আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো হয়েছিল। পরবর্তীতেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর মধ্যে একাধিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ফলে সাময়িক হামলা বা মাইন পাতা হলেও বাজারে তার প্রভাব বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে।
বিকল্প সরবরাহ কতটা স্বস্তি দেবে
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের উৎপাদন বেড়েছে। সৌদি আরবও সাম্প্রতিক দিনে রপ্তানি বাড়িয়ে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ওপেক প্লাস জোটও উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানি রুটে বড় বিঘ্ন ঘটলে এই অতিরিক্ত উৎপাদনের সুফল অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু বিকল্প রুট থাকলেও তা পুরো ঝুঁকি সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার আশঙ্কা
ওয়াশিংটনের বক্তব্য ও সামরিক প্রস্তুতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ইরান যদি নিজেদের নেতৃত্বকে বড় হুমকির মুখে দেখে, তাহলে তেলক্ষেত্র, রপ্তানি টার্মিনাল ও প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রেও হামলা বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটের মুখে পড়বে বিশ্ব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















