মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিশোধ, অনিশ্চয়তা ও তীব্র সামরিক উত্তেজনা। তেহরান থেকে দুবাই—একই সঙ্গে শোক, ক্ষোভ, উদযাপন আর আতঙ্কে দুলছে পরিস্থিতি।
খামেনির মৃত্যু ও নেতৃত্ব সংকট
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার দপ্তরে কর্মরত অবস্থায় হামলার শিকার হন খামেনি। টানা ছত্রিশ বছর ধরে তিনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন। তার মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তীকালীনভাবে একটি নেতৃত্ব পরিষদ দায়িত্ব নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি প্রতিশোধের অঙ্গীকার করেছেন।
খামেনির মৃত্যুতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কোথাও আনন্দ, কোথাও বিক্ষোভ, আবার কোথাও গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। ইরানের ভেতরেও মতভেদ স্পষ্ট।

ইসরায়েলের নতুন হামলা ও উপসাগরে পাল্টা আঘাত
রোববার তেহরানে নতুন করে হামলা চালায় ইসরায়েল। তাদের দাবি, আকাশপথে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই এই অভিযানের লক্ষ্য। অন্যদিকে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে। ইসরায়েলের বেইত শেমেশ শহরে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে নয়জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আমিরাতে তিনজন এবং কুয়েতে একজনের মৃত্যুর খবর মিলেছে।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেবেল আলি বন্দরে আগুন লাগে। দুবাই মেরিনা ও পাম জুমেইরাহ এলাকায় আবাসিক ভবন ও হোটেলে আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ। বিলাসবহুল একাধিক স্থাপনায় আগুন ধরে যায়। রমজান মাসে এমন হামলা উপসাগরীয় অর্থনীতি ও পর্যটন খাতে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও জ্বালানি শঙ্কা
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বাজারে। তেলের দাম বাড়ছে, জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, বিমান চলাচলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব তেল ও গ্যাস বাজারে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে রাশিয়া। ইতিমধ্যে কয়েকটি জ্বালানি কোম্পানি ওই পথ দিয়ে পরিবহন স্থগিত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে ক্ষমতার শূন্যতা এবং দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন। মুদ্রাস্ফীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিও চাপের মুখে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের নতুন নেতৃত্ব আলোচনায় আগ্রহী হলে তিনি কথা বলতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি ইরানিদের তাদের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই মতভেদ দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র এক-চতুর্থাংশ আমেরিকান এই হামলাকে সমর্থন করছেন। অর্ধেকের বেশি মনে করেন, ট্রাম্প সামরিক শক্তি ব্যবহারে অতিরিক্ত আগ্রহী।
এদিকে অভিযানে তিন মার্কিন সেনা নিহত ও আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ। এটি ট্রাম্পের নতুন মেয়াদে প্রথম বড় সামরিক হতাহতের ঘটনা।
নেটো ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি
নেটো জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য হুমকির মুখে সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
![]()
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে উত্তেজনা প্রশমনে যে কোনো গম্ভীর উদ্যোগের প্রতি তেহরানের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। ওমান বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে।

সাইবার হামলা ও ভেতরের অস্থিরতা
যৌথ হামলার সময় ইরানের একাধিক সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়। একটি জনপ্রিয় ধর্মীয় ক্যালেন্ডার অ্যাপে বার্তা দিয়ে সশস্ত্র বাহিনীকে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে একটি শহরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতার স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যা অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চিত আগামী
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এমন বড় নেতৃত্ব সংকট ইরান আগে দেখেনি। এখন প্রশ্ন, দেশটি কোন পথে যাবে। দ্রুত স্থিতিশীল রূপান্তর, নাকি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা—এই দোলাচলে গোটা অঞ্চল দাঁড়িয়ে আছে এক অজানা ভবিষ্যতের সামনে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















