ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে চীন। তেহরান যখন গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে, তখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতার মাঝেও ইরানের সঙ্গে চীনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়বে না।
খামেনির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি
৮৬ বছর বয়সী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন বলে রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করে। প্রায় চার দশক ধরে ইরানের রাজনীতিতে একক প্রভাব বিস্তারকারী এই নেতার মৃত্যু দেশটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আহ্বান জানান। তিনি ইরানি জনগণকে নিজেদের সরকার নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান।
খামেনির মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এতে রয়েছেন কট্টরপন্থী আলিরেজা আরাফি, সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই। এই তিন সদস্যের পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে। নতুন নেতা নির্বাচন করবে ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ।
এদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনা ও মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা শুরু করেছে।

চীনের কড়া অবস্থান
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে খামেনি হত্যাকে ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ ও উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার মধ্যেই এ ধরনের হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাকে হত্যা করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা মেনে নেওয়া যায় না।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক কি টিকবে?
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা ও প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে চীনের অবস্থান অটুট থাকবে। সাংহাই আন্তর্জাতিক গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ওয়েন শাওবিয়াও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি পশ্চিমাপন্থী সরকার গঠনে চাপ দেয়, তবুও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হবে না।
তার মতে, ইরান যদি উন্মুক্ত অর্থনীতির দিকে যায়, তবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য প্রত্যাখ্যান করবে না। বরং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।
চীন ও ইরানের সম্পর্ক বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও আঞ্চলিক কৌশলগত বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে। তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে চীন বড় আকারের বিনিয়োগে সতর্ক ছিল, যা তেহরানের সঙ্গে মাঝে মাঝে মতবিরোধের কারণ হয়েছে। তা সত্ত্বেও ইরানি তেল আমদানির মাধ্যমে চীন তেহরানকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে এসেছে।

চীনের কূটনৈতিক বাস্তববাদ
মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালন করা এক সাবেক চীনা কূটনীতিকের মতে, চীনের বিশাল জ্বালানি চাহিদা, শক্তিশালী উৎপাদন সক্ষমতা ও শর্তহীন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের প্রস্তাব ইরানকে চীনের সঙ্গে যুক্ত রাখবে, সরকার যাই হোক না কেন।
তিনি আরও বলেন, খামেনির মৃত্যুর পর দ্রুত অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব গঠন এবং উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সংগঠিত পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতাও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দৃঢ়তা প্রমাণ করে।
এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আন্দ্রেয়া ঘিসেল্লি মনে করেন, নেতৃত্ব পরিবর্তন চীন-ইরান সম্পর্কের বড় বাধা হবে না। তার ভাষায়, চীন অত্যন্ত বাস্তববাদী কূটনীতি অনুসরণ করে। নতুন নেতৃত্বের অনেকেই আগে থেকেই বেইজিংয়ের সঙ্গে কাজ করেছেন, এমন সম্ভাবনাও রয়েছে। তিনি মনে করেন, তুলনামূলকভাবে কম মতাদর্শিক নেতৃত্ব চীন স্বাগত জানাতেও পারে।
রিহলা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভাইজরির প্রতিষ্ঠাতা জেসি মার্কস বলেন, মিসর ও সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও চীন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে সক্ষম হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ অটুট থাকায় শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আলোচনা এখনো বাস্তবতা থেকে দূরে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব
যদিও দুই দেশের সম্পর্ক হঠাৎ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম, তবুও ইরানে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা চীনের কৌশলগত প্রভাব কিছুটা ধাক্কা খেতে পারে। ওয়াং ই রাশিয়ার সঙ্গে আলাপে সতর্ক করেন, পরিস্থিতি বিপজ্জনক খাদে গড়িয়ে যেতে পারে। তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোকে সংযম প্রদর্শন এবং দ্রুত সংলাপে ফেরার আহ্বান জানান।
তার মতে, যুদ্ধ থামাতে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় সব পক্ষের জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন।
এই সংকটের মাঝেও পরিষ্কার যে, ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও বেইজিং-তেহরান সম্পর্ক বাস্তববাদী স্বার্থের ভিত্তিতেই এগোবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















