পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্তজুড়ে নতুন করে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। আফগান বাসিন্দা ও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির পাশাপাশি একাধিক স্থানে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। উত্তর কাবুলের সাবেক মার্কিন বিমানঘাঁটি বাগরামেও হামলার অভিযোগ উঠেছে।
সীমান্তজুড়ে উত্তেজনার বিস্তার
গত বৃহস্পতিবার আফগানিস্তান সীমান্তে অভিযান শুরুর পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। এর জবাবে পাকিস্তান সীমান্তে এবং আকাশপথে পাল্টা হামলা চালায়। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা রাতভর গোলাগুলির কথা জানিয়েছেন। নানগারহার প্রদেশের তথ্য বিভাগ ও পুলিশের বরাতে জানা গেছে, ড্রোন হামলায় অন্তত দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

বাগরাম ঘাঁটিতে হামলার দাবি
কাবুলের উত্তরে অবস্থিত বাগরাম বিমানঘাঁটিতে বিমান হামলা হয়েছে বলে এক বাসিন্দা দাবি করেন। নিরাপত্তার কারণে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি। আরেক বাসিন্দা জানান, ভোরের হামলাটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং বিমানবন্দরের উত্তর দিক থেকে ধোঁয়া ও আগুনের কুণ্ডলী দেখা যায়। তিনি এটিকে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে প্রাদেশিক মুখপাত্র ফজল উল রহিম মাসকিন ইয়ার বলেন, পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ঘাঁটিতে বোমা হামলার চেষ্টা করলেও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা বা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
পাকিস্তানের অবস্থান ও নতুন লক্ষ্যবস্তু
শুক্রবার পাকিস্তান কাবুল ও কান্দাহারসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরে বোমা হামলার কথা স্বীকার করে। কান্দাহার আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ নেতার আবাসস্থল। তবে রোববারের হামলা নিয়ে ইসলামাবাদ কোনো মন্তব্য করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের উত্তেজনায় পাকিস্তান প্রথমবারের মতো আফগান সরকারি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর আগে তারা দাবি করত, হামলা কেবল জঙ্গি আস্তানায় সীমাবদ্ধ ছিল। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারার জানান, অভিযান শুরুর পর থেকে আফগানিস্তানের ৪১টি স্থানে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তার দাবি, এসব সংঘর্ষে ৩৫০-এর বেশি আফগান সেনা নিহত হয়েছে। এর আগে পাকিস্তান জানায়, তাদের ১২ জন সেনা নিহত হয়েছে।
কাবুল ও সীমান্ত প্রদেশে আতঙ্ক
কাবুলে বিস্ফোরণের শব্দ ও টানা গুলির আওয়াজ শোনা গেছে। তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, পাকিস্তানি বিমানের দিকে আকাশ প্রতিরক্ষা থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে। শহরের কেন্দ্রস্থলে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে এবং একাধিক নতুন তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে।
খোস্ত প্রদেশে ড্রোনের শব্দ শোনা গেছে বলে এএফপির এক সাংবাদিক জানান। জালালাবাদ শহরে একজন আলোকচিত্রী আকাশে যুদ্ধবিমান উড়তে দেখেছেন। আফগান সরকারের উপমুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাতের দাবি, বৃহস্পতিবার থেকে পাকিস্তানের গোলাবর্ষণে বিভিন্ন প্রদেশে ৩৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ বিষয়ে পাকিস্তান কোনো মন্তব্য করেনি।

তালেবান-টিটিপি ইস্যুতে পুরোনো দ্বন্দ্ব
ইসলামাবাদ অভিযোগ করছে, পাকিস্তানে হামলা চালানো জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আফগানিস্তান ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তবে তালেবান সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ২০২১ সালে কাবুলে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি পাকিস্তানে হামলা বাড়িয়েছে বলে দাবি করা হয়।
আফগান উপমুখপাত্র ফিতরাতের দাবি, সংঘর্ষে ৮০-এর বেশি পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে এবং ২৭টি সামরিক চৌকি দখল করা হয়েছে। এর আগে আফগান সরকার তাদের ১৩ সেনা নিহত হওয়ার কথা জানায়। উভয় পক্ষের হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
তোরখাম সীমান্ত ও মানবিক সংকট

তোরখাম সীমান্ত ক্রসিংয়ে, যা পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা আফগানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ, সেখানে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। খোস্ত প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বহু মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। ৪৬ বছর বয়সী বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা জাভেদ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও অতীতের প্রেক্ষাপট
যুদ্ধবিরতির জন্য সৌদি আরব ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশ উদ্যোগ নিলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান আসেনি। গত বছর কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়েছিল এবং একাধিক দফায় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তবে সাম্প্রতিক সহিংসতা গত অক্টোবরের পর সবচেয়ে ভয়াবহ বলে মনে করা হচ্ছে। ওই সময়ের সংঘর্ষে উভয়পক্ষের ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল এবং তখন থেকেই স্থলসীমান্ত প্রায় বন্ধ রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। সীমান্তজুড়ে সামরিক উত্তেজনা ও বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















