০৬:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬
নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছে ইরান ইরানের হামলার ভয়ে সৌদি,কুর্দিস্তান ও ইসরায়েলের তেল-গ্যাস স্থাপনা বন্ধ ট্রাম্প কি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ থেকে ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’? ইরানি অভিযোগে নতুন বিতর্ক ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা ঘিরে পাল্টাপাল্টি দাবি  রাজধানীর সায়েদাবাদে মাদকবিরোধী অভিযানে গুলিবিদ্ধ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মধ্যপ্রাচ্যে দুই বাংলাদেশি নিহত, সাতজন আহত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান কুয়েত সিটির কাছে বিধ্বস্তের ভিডিও প্রকাশ ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দলের প্রার্থী চায় সরকার: সালাহউদ্দিন খামেনির মৃত্যুর পরও ভেঙ্গে পড়েনি ইরান, কঠোরভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে যুদ্ধ  ইরানে হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা ট্রাম্পের, আরও মার্কিন সেনা মৃত্যুর আশঙ্কা

ইরানে বোমা বর্ষণ, স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি নাকি নতুন অস্থিরতার শুরু?

ইরানের আকাশে বোমা পড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য হচ্ছে শাসনব্যবস্থা উল্টে দেওয়া, সামরিক শক্তি ধ্বংস করা এবং পারমাণবিক সক্ষমতার অবসান ঘটানো। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এমন অভিযানের পরপরই শান্তি ও স্থিতিশীলতা নেমে আসে—এমন উদাহরণ খুবই কম। বরং অনেক সময় শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা।

স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতার অনিশ্চয়তা

এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। তাঁর দাবি, হামলা শেষ হলে সরকার হবে জনগণের। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, বাস্তবে কি ইরান একটি মুক্ত ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু শাসক অপসারণ মানেই স্থায়ী গণতন্ত্র নয়।

ইতিহাস যা বলছে

বিভিন্ন সামরিক হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো দেশ আক্রমণের পর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ে। প্রথমত, জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন কতটা গভীর। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর এই বিভাজন দেশটিকে দীর্ঘ গৃহসংঘাতে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে জাপানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামাজিক ঐক্য পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখে অভ্যন্তরীণ সংহতি।

ইরান দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ সমাজ ছিল। তবে গত কয়েক দশকে সংখ্যালঘুদের ওপর দমন-পীড়ন পুরনো ক্ষতকে উসকে দিয়েছে। ফলে সামরিক অভিযানের পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

দুর্বল প্রতিষ্ঠান, ভঙ্গুর অর্থনীতি

দ্বিতীয় বড় প্রশ্ন, রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা কার্যকর। দুর্নীতি, গণতান্ত্রিক কাঠামোর অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনআস্থার সংকট ইরানের প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করেছে। যুদ্ধের সময় মানবিক সহায়তা সমন্বয় বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এসব দুর্বলতা বড় সংকট ডেকে আনতে পারে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও দেশটি চাপে। মূল্যস্ফীতি আকাশছোঁয়া, মুদ্রার মান ব্যাপকভাবে কমেছে, পরিবেশগত সংকটও তীব্র হয়েছে। এমন অবস্থায় যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন হবে অত্যন্ত কঠিন।

শাসনের সহিংস অতীত

ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ইতিহাস বলছে, অস্তিত্ব সংকটে তারা কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছে। আশির দশকে হাজারো রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যুদণ্ড তার নজির। সাম্প্রতিক বিক্ষোভেও বহু বেসামরিক মানুষ নিহত ও গ্রেপ্তার হয়েছেন। ফলে বর্তমান সংঘাত টিকে গেলে আরও কঠোর দমন-পীড়নের আশঙ্কা থেকেই যায়।

কী হতে পারে সামনে

সামরিক হামলায় শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, পরবর্তী শূন্যতা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ডেকে আনতে পারে। অতীতে লিবিয়া, ইরাক কিংবা সিরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়লে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা শুরু হয়। ইরানও সেই ঝুঁকির বাইরে নয়।

এখন কী প্রয়োজন

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সমন্বয় ভেঙে পড়েছিল। যুদ্ধের সময় খোলা যোগাযোগব্যবস্থা জীবন বাঁচাতে পারে।

বিদেশে থাকা ইরানিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। লক্ষাধিক দক্ষ পেশাজীবী দেশে ফিরে এলে প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণ ও মানবিক সহায়তায় বড় অবদান রাখতে পারেন।

এছাড়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রশ্নও সামনে আসছে। নিষেধাজ্ঞা শাসকগোষ্ঠীকে পুরোপুরি দুর্বল করতে পারেনি, বরং সাধারণ মানুষকেই বেশি ভুগতে হয়েছে। যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক সংযোগ পুনরুদ্ধার অপরিহার্য হতে পারে।

যুদ্ধের ফল যাই হোক, কেবল দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না। আন্তর্জাতিক সমন্বয়, তৃণমূল উদ্যোগ এবং মানবিক অগ্রাধিকারই নির্ধারণ করবে ইরানের ভবিষ্যৎ।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছে ইরান

ইরানে বোমা বর্ষণ, স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি নাকি নতুন অস্থিরতার শুরু?

০৪:১৪:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

ইরানের আকাশে বোমা পড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য হচ্ছে শাসনব্যবস্থা উল্টে দেওয়া, সামরিক শক্তি ধ্বংস করা এবং পারমাণবিক সক্ষমতার অবসান ঘটানো। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এমন অভিযানের পরপরই শান্তি ও স্থিতিশীলতা নেমে আসে—এমন উদাহরণ খুবই কম। বরং অনেক সময় শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা।

স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতার অনিশ্চয়তা

এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। তাঁর দাবি, হামলা শেষ হলে সরকার হবে জনগণের। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, বাস্তবে কি ইরান একটি মুক্ত ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু শাসক অপসারণ মানেই স্থায়ী গণতন্ত্র নয়।

ইতিহাস যা বলছে

বিভিন্ন সামরিক হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো দেশ আক্রমণের পর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ে। প্রথমত, জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন কতটা গভীর। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর এই বিভাজন দেশটিকে দীর্ঘ গৃহসংঘাতে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে জাপানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামাজিক ঐক্য পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখে অভ্যন্তরীণ সংহতি।

ইরান দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ সমাজ ছিল। তবে গত কয়েক দশকে সংখ্যালঘুদের ওপর দমন-পীড়ন পুরনো ক্ষতকে উসকে দিয়েছে। ফলে সামরিক অভিযানের পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

দুর্বল প্রতিষ্ঠান, ভঙ্গুর অর্থনীতি

দ্বিতীয় বড় প্রশ্ন, রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা কার্যকর। দুর্নীতি, গণতান্ত্রিক কাঠামোর অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনআস্থার সংকট ইরানের প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করেছে। যুদ্ধের সময় মানবিক সহায়তা সমন্বয় বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এসব দুর্বলতা বড় সংকট ডেকে আনতে পারে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও দেশটি চাপে। মূল্যস্ফীতি আকাশছোঁয়া, মুদ্রার মান ব্যাপকভাবে কমেছে, পরিবেশগত সংকটও তীব্র হয়েছে। এমন অবস্থায় যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন হবে অত্যন্ত কঠিন।

শাসনের সহিংস অতীত

ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ইতিহাস বলছে, অস্তিত্ব সংকটে তারা কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছে। আশির দশকে হাজারো রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যুদণ্ড তার নজির। সাম্প্রতিক বিক্ষোভেও বহু বেসামরিক মানুষ নিহত ও গ্রেপ্তার হয়েছেন। ফলে বর্তমান সংঘাত টিকে গেলে আরও কঠোর দমন-পীড়নের আশঙ্কা থেকেই যায়।

কী হতে পারে সামনে

সামরিক হামলায় শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, পরবর্তী শূন্যতা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ডেকে আনতে পারে। অতীতে লিবিয়া, ইরাক কিংবা সিরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়লে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা শুরু হয়। ইরানও সেই ঝুঁকির বাইরে নয়।

এখন কী প্রয়োজন

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সমন্বয় ভেঙে পড়েছিল। যুদ্ধের সময় খোলা যোগাযোগব্যবস্থা জীবন বাঁচাতে পারে।

বিদেশে থাকা ইরানিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। লক্ষাধিক দক্ষ পেশাজীবী দেশে ফিরে এলে প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণ ও মানবিক সহায়তায় বড় অবদান রাখতে পারেন।

এছাড়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রশ্নও সামনে আসছে। নিষেধাজ্ঞা শাসকগোষ্ঠীকে পুরোপুরি দুর্বল করতে পারেনি, বরং সাধারণ মানুষকেই বেশি ভুগতে হয়েছে। যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক সংযোগ পুনরুদ্ধার অপরিহার্য হতে পারে।

যুদ্ধের ফল যাই হোক, কেবল দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না। আন্তর্জাতিক সমন্বয়, তৃণমূল উদ্যোগ এবং মানবিক অগ্রাধিকারই নির্ধারণ করবে ইরানের ভবিষ্যৎ।