হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছুঁতে পারে—এমন আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। মার্কিন-ইসরায়েলি সমন্বিত হামলার জেরে ইরানের কড়া পাল্টা প্রতিক্রিয়া বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাবে বাজার বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে অস্থির লেনদেনের পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে।
দাম বাড়ার তীব্র আশঙ্কা
গত শুক্রবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮২ ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ছিল প্রায় ৭৮ ডলার। তবে বাজার পুনরায় চালু হলে দামে বড় উল্লম্ফনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও জ্বালানি পরামর্শকদের প্রাথমিক ইঙ্গিত বলছে, ট্যাঙ্কার চলাচল বাধাগ্রস্ত থাকলে এক সেশনেই ব্যারেলপ্রতি ১০ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। এতে ব্রেন্টের দাম ৯০ ডলারের মাঝামাঝি থেকে উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, এমনকি চরম পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে ১০০ ডলারও ছুঁতে পারে।

ঝুঁকির মাত্রা বেড়েছে
সপ্তাহান্তে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। শুরুতে সীমিত সামরিক অভিযান থাকলেও তা এখন সামুদ্রিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর কাঠামোগত হুমকিতে পরিণত হয়েছে। রাইস্ট্যাড এনার্জির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান জর্জ লিওনের মতে, ইরানের প্রতিক্রিয়া আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিস্তৃত ও আক্রমণাত্মক। বিভিন্ন প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলার কথাও উঠে এসেছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানো কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
আনুষ্ঠানিক অবরোধ নয়, তবু কার্যত স্থবিরতা
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ ঘোষণা করা হয়নি, বাস্তবে পার্থক্য খুব কম। ট্যাঙ্কার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানিগুলো চরম সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। একাধিক জাহাজ প্রণালীতে প্রবেশ বিলম্বিত করেছে। সরাসরি শক্তি প্রয়োগে বন্ধ হোক বা ঝুঁকি এড়াতে অচল হয়ে থাকুক, ফল একই—বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় ৩০ শতাংশের ওপর হঠাৎ চাপ তৈরি হয়েছে।
![]()
বিকল্প পথেও সীমিত স্বস্তি
সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরিয়ে নিতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত আবুধাবি ক্রুড পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল পরিবহন করতে সক্ষম। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ কার্যকরভাবে বন্ধ থাকলে প্রতিদিন ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ব্যারেল তেল ঝুঁকির মধ্যে থেকে যাবে।
এই সম্ভাব্য ঘাটতি সাম্প্রতিক যেকোনো সরবরাহ সংকটকে ছাড়িয়ে যাবে এবং ওপেক প্লাসের সযত্নে ব্যবস্থাপিত অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে। রাইস্ট্যাড এনার্জি সতর্ক করে বলেছে, বৈশ্বিক মজুত বিপজ্জনকভাবে কম না হলেও প্রকৃত সুরক্ষা বলয় সীমিত, কারণ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা মূলত উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের হাতে, যাদের রপ্তানিও হরমুজের ওপর নির্ভরশীল।
বিনিয়োগ ব্যাংকের পূর্বাভাস
গোল্ডম্যান স্যাকস আগে হিসাব দিয়েছিল, প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল সরবরাহ ব্যাহত হলে ব্রেন্টের দাম ১০ থেকে ১৫ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তার কয়েকগুণ বড় ঘাটতির আশঙ্কা থাকায় বাজার বড়সড় মূল্যসমন্বয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। রাইস্ট্যাডের মতে, নিরসনের বিশ্বাসযোগ্য সংকেত না এলে বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রেন্ট প্রায় ২০ ডলার পর্যন্ত লাফ দিতে পারে।

পরিবহন জট ও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা
বিশ্লেষকদের ধারণা, এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে চলাচল আংশিক স্বাভাবিক হলেও পণ্যবাহী জাহাজের জট, পুনর্নির্ধারিত চালান এবং বাড়তি ভাড়া ও বীমা খরচের কারণে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আনুষ্ঠানিকভাবে পথ খুলে গেলেও সরবরাহ শৃঙ্খল পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
কৌশলগত মজুতের সম্ভাবনা
চীনসহ প্রধান ভোক্তা দেশ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্যদের কৌশলগত তেল মজুত প্রয়োজনে ব্যবহার করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আগেও জানিয়েছে, বড় ধরনের সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে তারা সমন্বিতভাবে মজুত ছাড়তে প্রস্তুত। তবে এসব মজুত সাময়িক ধাক্কা সামলানোর জন্য, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত বাধা মোকাবিলার জন্য নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















