তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানকে কঠোর হাতে শাসন করা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আর নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ঘোষণা আসে। ৮৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হামলার মাঝেই মৃত্যু, উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার সময় খামেনি নিহত হন বলে জানানো হয়। দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছিল। হামলার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে অঞ্চলে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছিল। হামলার পর ইরানের ভেতরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আহ্বানও জানানো হয়।
খামেনির মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে নতুন সমঝোতার আলোচনা চালাচ্ছিল। তবে সেই আলোচনা মাঝপথেই থেমে যায় সামরিক অভিযানের কারণে।
কঠোর নীতির স্থপতি
১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর আয়াতুল্লাহ খামেনি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে কড়া ইসলামপন্থী ও পশ্চিমবিরোধী নীতির পথে দৃঢ়ভাবে পরিচালিত করেন। দেশীয় রাজনীতিতে তিনি সংস্কারের প্রচেষ্টা বারবার থামিয়ে দেন। সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করতে গ্রেপ্তার, মৃত্যুদণ্ড ও কঠোর নিরাপত্তা অভিযান ছিল নিয়মিত ঘটনা।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তাঁর শাসনের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে। সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই বাহিনীর প্রভাব বাড়িয়ে তিনি নিজের ক্ষমতার ভিত আরও শক্ত করেন।
আন্দোলন, দমন আর ক্ষোভ
গত এক দশকে ইরানে একাধিক গণবিক্ষোভ হয়েছে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর পর নারীদের নেতৃত্বে দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানে রাজপথ উত্তাল হয়। শত শত মানুষ নিহত ও হাজারো গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন দমন করা হয়।
২০২৬ সালের শুরুতেও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানা যায়। এতে জনঅসন্তোষ আরও গভীর হয়।
আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার
খামেনির নেতৃত্বে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার বাড়ায়। গাজা, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনে মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি প্রভাববলয় গড়ে তোলা হয়। এই কৌশল ইসরায়েলের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র করে।
২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। ২০২৪ সালে ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়, যদিও অধিকাংশই প্রতিহত হয়।
পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা
পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণকে ইরানের সার্বভৌম অধিকার বলে দাবি করেন খামেনি। ২০১৫ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে তিনি সম্মতি দিলেও পরে তা ভেঙে যায়। পরবর্তী সময়ে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি চাপে পড়ে।
ইসরায়েলের নেতৃত্বে একাধিক গোপন অভিযান, বিজ্ঞানী হত্যাকাণ্ড ও স্থাপনায় হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ২০২৫ সালে বড় ধরনের হামলায় ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ক্ষমতায় আরোহন ও ব্যক্তিজীবন
১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া খামেনি অল্প বয়স থেকেই ধর্মীয় শিক্ষায় বেড়ে ওঠেন। ইরানের বিপ্লবের সময় তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পান। সংবিধান সংশোধন করে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পথ সুগম করা হয়।
ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে খুব কম তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে তিনি ছয় সন্তানের জনক। দীর্ঘ ৩৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থেকে তিনি আধুনিক ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী শাসক হয়ে ওঠেন।
বিতর্কিত উত্তরাধিকার
সমর্থকদের মতে, তিনি কঠিন আন্তর্জাতিক পরিবেশে ইরানকে টিকিয়ে রেখেছেন। সমালোচকদের চোখে তিনি ছিলেন কঠোর, আপসহীন এবং বিরোধীদের প্রতি নির্মম এক শাসক। তাঁর নীতির কারণে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ে এবং দেশের ভেতরে দমন-পীড়ন বাড়ে।
তাঁর মৃত্যু ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















