ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং ইসরাইলের অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাতের ব্যাপ্তি ও সময়কালই নির্ধারণ করবে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার মাত্রা।
ইরানের ওপর শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা মূলত নির্ভর করবে সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান উদীয়মান বাজার বিশ্লেষক উইলিয়াম জ্যাকসন বলেন, প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পরিসর এবং তার প্রভাব তেলের বাজারে কতটা পড়ে তার ওপর। তাঁর মতে, সীমিত আকারের হামলা হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের দিকে যেতে পারে। তবে সংঘাত দীর্ঘ হলে এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দাম আরও অনেক বেশি বাড়তে পারে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।

সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা কয়েক দিন ধরে চলতে পারে। একই সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত মিলেছে। ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা পাল্টা হিসেবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
উইলিয়াম জ্যাকসন বলেন, ইরানের পাল্টা হামলা ইসরাইলের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। গত বছরের জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের জিডিপি দ্বিতীয় প্রান্তিকে ত্রৈমাসিক হিসাবে ১ দশমিক ১ শতাংশ কমেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তি ঝুঁকি
শুধু ইসরাইল নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো—যেমন বাহরাইন ও কাতারে—ইরানের সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি রয়েছে। এতে সামরিক ও বেসামরিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে। আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেলে বাণিজ্য ও ভ্রমণ খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে মূল প্রভাব নির্ধারিত হবে তেলের বাজারের পরিস্থিতি দিয়ে।
তেলের দামে রাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাব
জ্যাকসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতির কারণে তেলের দামে রাজনৈতিক ঝুঁকির প্রিমিয়াম ইতিমধ্যে বেড়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭৩ ডলার। সীমিত হামলা অব্যাহত থাকলেও তা ৮০ ডলারে উঠতে পারে, যা আগের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ের সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি।
তবে সংঘাত দীর্ঘ হলে এবং বিশেষ করে ইরানের তেল সরবরাহ ব্যাহত হলে বা ইরান হরমুজ প্রণালী অবরোধের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। সে ক্ষেত্রে তেলের দাম লাফিয়ে ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ওপেক প্লাসের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত

পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা ওপেক প্লাসকে উৎপাদন কোটা বাড়ানোর দিকে ঠেলে দিতে পারে। চলতি সপ্তাহান্তের বৈঠকে সংগঠনটি উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি বাজারে প্রতিদিন ১ লাখ ৩৭ হাজার ব্যারেল উৎপাদন বৃদ্ধির যে গুঞ্জন রয়েছে, তার চেয়েও বেশি বাড়ানো হতে পারে।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে এই সামরিক উত্তেজনা কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও একটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















