পারস্য উপসাগরে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে একের পর এক ট্যাংকার প্রণালী এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সেই পথেই অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা দ্রুত বাড়ছে।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব কেন এত বেশি
ইরানের দক্ষিণ সীমান্তঘেঁষা হরমুজ প্রণালী মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রধান করিডর। সৌদি আরব, ইরাক, ইরানসহ বড় উৎপাদক দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ তেল এই পথেই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসও এই রুট ব্যবহার করে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাল্টা প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে গোটা অঞ্চলে। এর জেরে বহু শিপিং কোম্পানি ঝুঁকি এড়াতে প্রণালী ব্যবহার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, একদিনেই চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ইরানের সতর্কবার্তা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরানের সামরিক বাহিনী জাহাজগুলোকে ওই এলাকা এড়িয়ে চলার সতর্কতা দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রণালী দিয়ে যাতায়াত নিরাপদ নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এখন পর্যন্ত প্রণালী অবরোধের কোনও সুস্পষ্ট সামরিক উদ্যোগের প্রমাণ মেলেনি।
তবু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। শিপিং খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এখন কেউই ওই পথে জাহাজ পাঠাতে আগ্রহী নন।
তেলের দামে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালী দিয়ে ট্যাংকার চলাচল যদি স্বল্প সময়ের জন্যও বন্ধ থাকে, তবুও বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে যাবে। বিশেষ করে ইরাক ও কাতারের মতো দেশগুলোর বিকল্প রপ্তানি পথ সীমিত। যদিও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আংশিক বিকল্প রুট ব্যবহার করতে পারে, তবুও সামগ্রিক সরবরাহে চাপ পড়বে।
গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল প্রায় ৭৩ ডলার। চলতি বছরে ইতিমধ্যেই দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। বাজার পুনরায় খুললেই দাম আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দাম কতদিন উঁচু থাকবে
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল প্রশ্ন হলো সংঘাত কতদূর গড়ায় এবং ইরান জ্বালানি অবকাঠামো বা জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালায় কি না। যদি হামলা বিস্তৃত হয়, তাহলে দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের বিরতির পর আবার জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। কারণ আঞ্চলিক উত্তেজনা একাধিক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়েছে।
লাল সাগরেও নতুন অনিশ্চয়তা
এই সংঘাতের প্রভাব শুধু হরমুজ প্রণালীতে সীমাবদ্ধ নয়। লাল সাগরও আবার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী আগেও জাহাজে হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার পর অনেক শিপিং কোম্পানি ২০২৬ সালে বড় পরিসরে লাল সাগরে ফেরার যে পরিকল্পনা করেছিল, তা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথেই চাপ তৈরি হয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্য পরিবহনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার শঙ্কা বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















