০৫:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
গণতন্ত্রের লড়াইয়ে স্মৃতির শক্তি: মেগাওয়াতি সুকর্ণোপুত্রির সংগ্রাম থেকে আজকের শিক্ষা জাতীয় সংসদের নামে জাল ডিও লেটার: যাচাই ছাড়া কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার সতর্কবার্তা ডেট্রয়েট-কানাডা সংযোগে নতুন সেতু, বাণিজ্যে গতি আনলেও বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা উত্তেজনা ট্রাম্পের নতুন শুল্কেও চাঙা মার্কিন অর্থনীতি, বাড়ছে পণ্যের দাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মহাপরিকল্পনা, ওপেনএআইকে ২৫০ বিলিয়ন ডলারের নিশ্চয়তা দিতে পারে এনভিডিয়া তীব্র তাপপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ গ্রিডে জরুরি অবস্থা, বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশ ইরান-হুথি সম্পর্ক: কারা এই হুথিরা, কেন আবার উত্তপ্ত হচ্ছে লোহিত সাগর সংকট? সংখ্যালঘু হত্যাকাণ্ডের মাসিক গড় ৩৩ শতাংশ বেড়েছে, নিরাপত্তাহীনতা কাটেনি: ঐক্য পরিষদ মেহেরপুরে এনসিপির পদযাত্রার আগে নাহিদ-হাসনাতদের ছবিসহ কুশপৌত্তলিকা, লেখা ছিল ‘এদের প্রতিহত করুন, এদের ঘৃণা করুন’ জঙ্গল ছালিমপুরে পানিতে বিষাক্ত রাসায়নিক, ৫৪ জনের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা

শুকিয়ে যাওয়া নদী, চরে সবুজ স্বপ্ন: কুড়িগ্রামে কৃষির সম্ভাবনা, জেলেদের বাড়ছে দুশ্চিন্তা

কুড়িগ্রামের উত্তরের একসময়ের প্রমত্ত ধরলা ও বরোমাসিয়া নদী এখন অনেকটাই শান্ত। সেই উত্তাল স্রোতের জায়গায় জেগে উঠেছে অসংখ্য নতুন চর। এসব চর এখন ধীরে ধীরে সবুজ ফসলের আচ্ছাদনে ভরে উঠছে। নদীর এই রূপান্তর একদিকে কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের মনে তৈরি করেছে গভীর উদ্বেগ।

নদীর চর জেগে ওঠার পেছনের কারণ

গত এক দশকে জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীতে পলি জমার কারণে ধরলা ও বরোমাসিয়া নদীর নাব্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে বন্যাপ্রবণ এলাকায় প্রায় ২৫০ হেক্টর নতুন চরভূমি উন্মুক্ত হয়েছে। আগে যেসব অংশে নৌকা ছাড়া চলাচল সম্ভব ছিল না, এখন সেসব নদীপথ হেঁটেই পার হওয়া যায়।

এই পরিবর্তনের ফলে ফুলবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চরভূমিতে বোরো ধান, ভুট্টা, তামাক, চিনাবাদামসহ নানা ফসলের আবাদ শুরু হয়েছে। গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এসব চরে নিয়মিত চাষাবাদ হচ্ছে এবং প্রতি বছরই ভালো ফলন মিলছে।

কৃষকদের নতুন আশা ও হিসাব

ধরলা নদীর তীরবর্তী সোনাইকাজী এলাকার কৃষক আলতাফ হোসেন ও মজিবুর রহমান স্মরণ করেন নদীর ভয়াল অতীতের কথা। একসময় এই নদী তাদের ঘরবাড়ি ও জমি গিলে নিয়েছিল, বহু মানুষকে নিঃস্ব করেছিল। এখন সেই নদীর শুকিয়ে যাওয়া চরেই তারা বোরো ধান চাষ করছেন।

আলতাফ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ২৮ মণ ধান উৎপাদনের আশা করছেন তারা। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারদরের ওঠানামা নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কাও রয়েছে। খরচ বেড়ে গেলে লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোজসেদ আলী বলেন, ধরলার চরে দীর্ঘদিন ধরেই বোরো ধান ও ভুট্টার আবাদ হয়ে আসছে। চলতি মৌসুমেও কৃষকরা ভালো ফলনের ব্যাপারে আশাবাদী।

নদী শুকিয়ে চর জেগেছে, সবুজে ভরেছে ধরলা–বারোমাসিয়া; স্বপ্ন দেখছেন কৃষক,  দুশ্চিন্তায় জেলে - বাহের দেশ

বরোমাসিয়া নদীর তীরবর্তী কৃষক আমজাদ হোসেন, রশিদ মিয়া, চান মিয়া ও আব্দুল মজিদ জানান, তারা চার থেকে পাঁচ বিঘা জমিতে ভুট্টার আবাদ করেছেন। অনুকূল আবহাওয়া থাকায় তারা বাম্পার ফলন ও ভালো বাজারদরের প্রত্যাশা করছেন।

জেলেদের জীবিকায় সংকট

কৃষকদের মুখে হাসি ফুটলেও নদীনির্ভর জেলে পরিবারগুলো পড়েছে চরম অনিশ্চয়তায়। একসময় ধরলা ও আশপাশের নদীগুলোতে বোয়াল, কাতলা, রুই, টেংরা ও ভেটকিসহ নানা প্রজাতির মাছ মিলত। কিন্তু পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও নদীর গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় এসব মাছ এখন ক্রমেই বিরল হয়ে পড়ছে। ফলে জেলেদের আয় কমে গেছে, জীবিকা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য ও লক্ষ্যমাত্রা

ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১০ হাজার ২০৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১০ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি জানান, ধরলা-বরোমাসিয়া ও নীলকমল নদীর অববাহিকায় ১২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান রোপণ করা হয়েছে। পুরো উপজেলায় ২ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ২৫০ হেক্টরই নদীর চরভূমিতে। এছাড়া চার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে।

নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, এ বছরের বোরো ও ভুট্টা ফসলের অবস্থা ভালো। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকরা বাম্পার ফলন পেতে পারেন এবং ন্যায্য দামও আশা করা যাচ্ছে।

নদীর রূপান্তর যে কুড়িগ্রামের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তা স্পষ্ট। তবে একই সঙ্গে নদীনির্ভর জেলেদের জীবিকা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ভারসাম্যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

গণতন্ত্রের লড়াইয়ে স্মৃতির শক্তি: মেগাওয়াতি সুকর্ণোপুত্রির সংগ্রাম থেকে আজকের শিক্ষা

শুকিয়ে যাওয়া নদী, চরে সবুজ স্বপ্ন: কুড়িগ্রামে কৃষির সম্ভাবনা, জেলেদের বাড়ছে দুশ্চিন্তা

০৪:২৯:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

কুড়িগ্রামের উত্তরের একসময়ের প্রমত্ত ধরলা ও বরোমাসিয়া নদী এখন অনেকটাই শান্ত। সেই উত্তাল স্রোতের জায়গায় জেগে উঠেছে অসংখ্য নতুন চর। এসব চর এখন ধীরে ধীরে সবুজ ফসলের আচ্ছাদনে ভরে উঠছে। নদীর এই রূপান্তর একদিকে কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের মনে তৈরি করেছে গভীর উদ্বেগ।

নদীর চর জেগে ওঠার পেছনের কারণ

গত এক দশকে জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীতে পলি জমার কারণে ধরলা ও বরোমাসিয়া নদীর নাব্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে বন্যাপ্রবণ এলাকায় প্রায় ২৫০ হেক্টর নতুন চরভূমি উন্মুক্ত হয়েছে। আগে যেসব অংশে নৌকা ছাড়া চলাচল সম্ভব ছিল না, এখন সেসব নদীপথ হেঁটেই পার হওয়া যায়।

এই পরিবর্তনের ফলে ফুলবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চরভূমিতে বোরো ধান, ভুট্টা, তামাক, চিনাবাদামসহ নানা ফসলের আবাদ শুরু হয়েছে। গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এসব চরে নিয়মিত চাষাবাদ হচ্ছে এবং প্রতি বছরই ভালো ফলন মিলছে।

কৃষকদের নতুন আশা ও হিসাব

ধরলা নদীর তীরবর্তী সোনাইকাজী এলাকার কৃষক আলতাফ হোসেন ও মজিবুর রহমান স্মরণ করেন নদীর ভয়াল অতীতের কথা। একসময় এই নদী তাদের ঘরবাড়ি ও জমি গিলে নিয়েছিল, বহু মানুষকে নিঃস্ব করেছিল। এখন সেই নদীর শুকিয়ে যাওয়া চরেই তারা বোরো ধান চাষ করছেন।

আলতাফ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ২৮ মণ ধান উৎপাদনের আশা করছেন তারা। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারদরের ওঠানামা নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কাও রয়েছে। খরচ বেড়ে গেলে লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোজসেদ আলী বলেন, ধরলার চরে দীর্ঘদিন ধরেই বোরো ধান ও ভুট্টার আবাদ হয়ে আসছে। চলতি মৌসুমেও কৃষকরা ভালো ফলনের ব্যাপারে আশাবাদী।

নদী শুকিয়ে চর জেগেছে, সবুজে ভরেছে ধরলা–বারোমাসিয়া; স্বপ্ন দেখছেন কৃষক,  দুশ্চিন্তায় জেলে - বাহের দেশ

বরোমাসিয়া নদীর তীরবর্তী কৃষক আমজাদ হোসেন, রশিদ মিয়া, চান মিয়া ও আব্দুল মজিদ জানান, তারা চার থেকে পাঁচ বিঘা জমিতে ভুট্টার আবাদ করেছেন। অনুকূল আবহাওয়া থাকায় তারা বাম্পার ফলন ও ভালো বাজারদরের প্রত্যাশা করছেন।

জেলেদের জীবিকায় সংকট

কৃষকদের মুখে হাসি ফুটলেও নদীনির্ভর জেলে পরিবারগুলো পড়েছে চরম অনিশ্চয়তায়। একসময় ধরলা ও আশপাশের নদীগুলোতে বোয়াল, কাতলা, রুই, টেংরা ও ভেটকিসহ নানা প্রজাতির মাছ মিলত। কিন্তু পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও নদীর গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় এসব মাছ এখন ক্রমেই বিরল হয়ে পড়ছে। ফলে জেলেদের আয় কমে গেছে, জীবিকা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য ও লক্ষ্যমাত্রা

ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১০ হাজার ২০৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১০ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি জানান, ধরলা-বরোমাসিয়া ও নীলকমল নদীর অববাহিকায় ১২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান রোপণ করা হয়েছে। পুরো উপজেলায় ২ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ২৫০ হেক্টরই নদীর চরভূমিতে। এছাড়া চার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে।

নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, এ বছরের বোরো ও ভুট্টা ফসলের অবস্থা ভালো। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকরা বাম্পার ফলন পেতে পারেন এবং ন্যায্য দামও আশা করা যাচ্ছে।

নদীর রূপান্তর যে কুড়িগ্রামের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তা স্পষ্ট। তবে একই সঙ্গে নদীনির্ভর জেলেদের জীবিকা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ভারসাম্যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।