টানা চার বছর বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতির স্বীকৃতি ধরে রেখে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে ভারত। গত বছর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে দেশটি আবারও প্রমাণ করেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রে তার অবস্থান ক্রমশ শক্ত হচ্ছে। উৎপাদন খাতের জোরালো সম্প্রসারণ এবং সেবা খাতের বিস্তার ভারতের এই অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে। এখন প্রশ্ন একটাই—কবে জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতির আসনে বসবে ভারত?
প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে, আকারে সামান্য পিছিয়ে
বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে গত বছর ভারতের প্রবৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে বেশি। যেখানে জাপানের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ, সেখানে ভারত অনেকটাই এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানিও ভারতের চেয়ে ধীরগতিতে বেড়েছে। তবে ডলারের হিসাবে মুদ্রার মান বিবেচনায় জাপানের ইয়েন তুলনামূলক শক্ত থাকায় ভারত আপাতত চতুর্থ অবস্থানেই রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালেই জাপানকে ছাড়িয়ে যেতে পারে ভারত।

ছোট ব্যবসার ভিড়ে বড় কোম্পানির দাপট
ভারতের অর্থনীতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—দেশের অধিকাংশ কর্মসংস্থান তৈরি করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক লাভের বড় অংশ যাচ্ছে বৃহৎ করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে। পারিবারিক মালিকানাধীন শতবর্ষী শিল্পগোষ্ঠীগুলো এখনও অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এই ধারারই একটি উদাহরণ বাজাজ গোষ্ঠী।
শতবর্ষী ব্যবসা থেকে আর্থিক সাম্রাজ্য
সঞ্জীব বাজাজ পারিবারিক অটোমোবাইল ব্যবসা থেকে আর্থিক সেবা খাতকে আলাদা করে নতুন দিগন্ত খুলেছেন। দুই হাজার সাত সালে সীমিত সম্পদ নিয়ে শুরু করা আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান আজ বিপুল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছে। বাজারমূল্য বেড়েছে বহুগুণ। এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সরকারের ডিজিটাল আধুনিকায়ন উদ্যোগ।
গত এক দশকে বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র ও ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার প্রসারের ফলে কোটি কোটি মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। মাসে প্রায় দুই হাজার কোটি লেনদেন এখন ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অল্প অঙ্কের লেনদেন হলেও বিপুল জনসংখ্যার কারণে সামান্য পরিবর্তনও বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। প্রতিদিনের লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এখন সহজেই ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে লাখো মানুষ আনুষ্ঠানিক ঋণ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সমৃদ্ধির পাশাপাশি বৈষম্যের চিত্র
অর্থনৈতিক শক্তি বাড়লেও ভারতের মাথাপিছু আয় এখনও তুলনামূলক কম। গড় বার্ষিক আয় প্রায় ২ হাজার ৯০০ ডলার সমমান। জাপান ও জার্মানির তুলনায় তা বহু গুণ কম। দেশে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ এখনো সরকারি সহায়তার খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। একদিকে ডেটা সেন্টার ও বিমানবন্দর নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ, অন্যদিকে জীবিকা নির্বাহে সংগ্রাম—এই বৈপরীত্যই ভারতের বাস্তবতা।
এই বৈষম্য সামাজিক বিভাজন বাড়ায় এবং জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ কঠিন করে তোলে। তবে প্রায় ৪০ কোটি তুলনামূলক সচ্ছল ভোক্তার বাজার যে কোনো ব্যবসার জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি করছে।
উৎপাদন বনাম সেবা খাতের টানাপোড়েন

স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তিতে উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন আরও দ্রুত প্রবৃদ্ধি, বিশেষ করে উৎপাদন খাতে। দুই হাজার পনের সালে ঘোষিত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির সময় অর্থনীতিতে উৎপাদন খাতের অংশ ছিল ১৬ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৩ শতাংশে।
ভারতের অর্থনীতির বড় চালিকা শক্তি এখন সেবা খাত—চিপ নকশা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রকৌশল, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কাজ এবং বাণিজ্য ও পরিবহন। বাজাজ গোষ্ঠীর উদাহরণেই দেখা যায়, একসময় উৎপাদনভিত্তিক ব্যবসা বড় ছিল, এখন আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানই আকারে এগিয়ে।
তবে উৎপাদন খাতও পিছিয়ে নেই। বছরে প্রায় ৪৫ লাখ মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা উৎপাদন করে দেশটি, যার প্রায় অর্ধেক রপ্তানি হয় ইন্দোনেশিয়া, মিশর ও মেক্সিকোর মতো দেশে।
![]()
ভবিষ্যতের দিগন্ত
বহুমাত্রিক অর্থনীতি ভারতের জন্য একদিকে স্থিতিশীলতা এনেছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সীমিত প্রভাবের কারণে বাণিজ্য আলোচনায় চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। তবু বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী ভারতের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আগামী এক দশকে এই তরুণ প্রজন্মই দেশটিকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতির আসনে নিয়ে যেতে পারে।
ভারতের অর্থনীতির উত্থান এখন আর কেবল সম্ভাবনার গল্প নয়, এটি বাস্তবতার পথে দ্রুত অগ্রসরমান এক যাত্রা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















