রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা খাওয়া জার্মানি এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখে। দেশটি রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প খুঁজে পেলেও দেশীয় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন দ্রুত কমে যাওয়ায় খরচ আকাশছোঁয়া হয়েছে। শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সাধারণ ভোক্তা—সবার ওপরই বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ, তবু চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল
সম্প্রতি জার্মানির জর্জসডর্ফ এলাকায় একটি শক্তিশালী নতুন প্রাকৃতিক গ্যাস কূপ চালু হওয়ায় কিছুটা আশার আলো দেখা গেছে। ২৩ কোটি ইউরো ব্যয়ে গড়ে ওঠা আদর্ফ গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় তিন লাখ পরিবারের গ্যাস চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, জার্মানির মোট চাহিদার তুলনায় এই সরবরাহ খুবই সামান্য। ২০০০ সালের পর থেকে দেশটির প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন মোট চাহিদার মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ জোগান দেয়।
রাশিয়া থেকে সরবরাহ বন্ধ, বিকল্পে ব্যয় বেড়েছে
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর জার্মানি তার প্রধান গ্যাস সরবরাহ হারায়। এরপর নরওয়ে থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা শুরু হয়।
কিন্তু এই নতুন ব্যবস্থায় ব্যয় অনেক বেড়েছে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম মহামারির আগের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। এর প্রভাব পড়েছে ইস্পাত কারখানা, রাসায়নিক শিল্পসহ জ্বালানি-নির্ভর উৎপাদন খাতে। অনেক প্রতিষ্ঠানই চাপে পড়ে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
মজুত কমে বাজারে চাপ
গত বছরের তুলনায় জার্মানিতে গ্যাস মজুতের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যেখানে এক বছর আগে মজুত ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ২১ শতাংশে। এই কম মজুত বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে এবং দামকে আরও অস্থির করছে।
দেশীয় উৎপাদনে বাধা কোথায়
শিল্প খাতের কর্মকর্তাদের মতে, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়া একটি বড় কারণ। পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির বিরুদ্ধে সামাজিক বিরোধিতা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক পরিবেশও নতুন বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে যেভাবে শেল গ্যাস উত্তোলন উৎপাদন বাড়িয়েছে, জার্মানিতেও তেমন সম্ভাবনা রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে দেশে ফ্র্যাকিং নিষিদ্ধ। ফলে নতুন গ্যাস উত্তোলনের পথ প্রায় বন্ধই রয়েছে।
সরকারি লক্ষ্য ২০৪৫ সালের মধ্যে তেল-গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করা। জলবায়ু সুরক্ষার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শিল্পখাত বলছে, এত স্বল্প সময়ে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে।
লাভ আছে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
সব বাধা সত্ত্বেও তেল-গ্যাস ব্যবসায় এখনো লাভ হচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে একটি বড় জ্বালানি কোম্পানির জার্মান শাখা ৩৯ মিলিয়ন ইউরো মুনাফা করেছে। আরেকটি প্রতিষ্ঠান ২০২৪ সালে ২৩ কোটি ইউরো লাভের কথা জানিয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে তেল ও গ্যাসে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান এখন নতুন জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। পূর্ব জার্মানির একটি গ্যাসক্ষেত্রে লিথিয়ামের বড় মজুতের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ভূ-তাপীয় শক্তি উৎপাদন নিয়েও পরিকল্পনা চলছে।
জ্বালানি রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে জার্মানি
জার্মানি একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, অন্যদিকে শিল্প ও গৃহস্থালির জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করতে চায়। এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মাঝেই দেশটি এখন জ্বালানি রূপান্তরের কঠিন পথে হাঁটছে।
রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমালেও নতুন নির্ভরতা, উচ্চ ব্যয় এবং কমে যাওয়া দেশীয় উৎপাদন—সব মিলিয়ে জার্মানির জ্বালানি খাত এখন এক গভীর রূপান্তরের সময় পার করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















