০৫:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাওয়া ব্যক্তিদের পর্যটন-ব্যবসায়িক ভিসা বাতিল করবে ট্রাম্প প্রশাসন নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার কারণ কি হিমবাহ ধস? নতুন তথ্য যা বলছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে পারমাণবিক ক্ষুদ্র চুল্লি, ব্যয় হবে ২২০ কোটি ডলার ইরানে ডলারের দাম ছাড়াল ২০ লাখ রিয়াল, চরম সংকটে সাধারণ মানুষের জীবন ডলারের স্থিতিশীলতা, জাপানি ইয়েনে বড় পরিবর্তন নেই—জ্যাকসন হোলের দিকে নজর বাজারের কিয়েভে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, শোনা গেল একের পর এক বিস্ফোরণ রাশিয়ার ওপর ‘স্লেজহ্যামার’ নিষেধাজ্ঞা, আগামী মাসে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে পাসের আশা কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আশায় ছিল গাড়ি নির্মাতারা, হঠাৎ দ্বিগুণ শুল্কের ধাক্কা এনভিডিয়ার আয় ৭০ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের জোয়ার আরও কয়েক বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের জাকারবার্গের বড় পরিকল্পনা যেভাবে ভেস্তে গেল

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি কি সাম্রাজ্যবাদ ফেরানোর ইঙ্গিত?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা, নাকি বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারের পুরনো সাম্রাজ্যবাদী ধারা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা—এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জোরালো হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ও ভাষণে স্পষ্ট হয়েছে, এটি নিছক বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়; বরং জোটকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বৈশ্বিক আধিপত্য জোরদারের কৌশল।

নতুন যুদ্ধ, পুরনো কৌশল

ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং দেশটির তেলসম্পদের ওপর দাবি তুলেছে, অন্যদিকে কিউবার ওপর অবরোধ জোরদার করেছে। কানাডা, গ্রিনল্যান্ড ও পানামা খাল নিয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক বক্তব্যও এসেছে হোয়াইট হাউস থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক সমাবেশ গড়ে তুলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে।

ট্রাম্প এই নীতিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বললেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিশ্ব থেকে সরে যাওয়া নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তিকে নতুনভাবে প্রয়োগ করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।

মিউনিখ ভাষণ ও সাম্রাজ্যের স্মৃতি

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভাষণ বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে। তিনি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক বিস্তারের ইতিহাসকে তুলে ধরে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পশ্চিমা শক্তি বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, কিন্তু পরে সেই প্রভাব কমে যায়। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনকে তিনি পশ্চিমা শক্তির পতনের কারণ হিসেবে আখ্যা দেন।

রুবিওর বক্তব্যে সাম্রাজ্যবাদী অতীতের প্রতি এক ধরনের গর্ব প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, মিত্রদের ‘দোষবোধে আবদ্ধ’ নয়, বরং নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত হওয়া উচিত। তার এই ভাষণ ইউরোপের কিছু ডানপন্থী মহলে প্রশংসা পেলেও বহু বিশ্লেষকের কাছে তা বিস্ময়কর মনে হয়েছে।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা

অনেক ইতিহাসবিদ ও নীতিবিশ্লেষক মনে করছেন, এই ধরনের ভাষা উপনিবেশ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো, যাদের জাতীয় পরিচয় গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, তারা এই অবস্থানকে উদ্বেগের চোখে দেখছে।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, আরব-ইসলামি বিশ্বে এই নীতির প্রভাব গুরুতর হতে পারে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের পুনরুত্থানের অভিযোগ তুলে নতুন সমর্থক টানার চেষ্টা করতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে পারে।

ঐতিহাসিক বাস্তবতা বনাম রাজনৈতিক ভাষণ

রুবিও তার বক্তব্যে ইউরোপীয় অভিবাসীদের আমেরিকা গঠনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করলেও, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নির্মম দমন-পীড়ন বা দাসপ্রথার ইতিহাসের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন। ইতিহাসবিদদের মতে, সাম্রাজ্যবাদকে শুধুমাত্র গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা বাস্তবতাকে আড়াল করে।

কিছু রক্ষণশীল ভাষ্যকার অবশ্য মনে করেন, রুবিও সাম্রাজ্যবাদ ফিরিয়ে আনতে চাননি; বরং পশ্চিমা সভ্যতার আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের কথা বলেছেন। তবে সমালোচকদের মতে, এই ‘সভ্যতাগত’ ভাষা আসলে বৈশ্বিক আধিপত্যের পুরনো ধারণাকেই নতুন মোড়কে উপস্থাপন করছে।

কোথায় যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি

বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্ব থেকে সরে আসছে না; বরং সামরিক প্রাধান্য পুনরুজ্জীবিত করছে। জোট ত্যাগ নয়, বরং সেগুলোকে চাপ প্রয়োগের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারই এখন কৌশল। এতে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ কি কেবল একটি স্লোগান, নাকি বিশ্বব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা? উত্তর যা-ই হোক, এর প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী হবে, তা এখনই স্পষ্ট।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাওয়া ব্যক্তিদের পর্যটন-ব্যবসায়িক ভিসা বাতিল করবে ট্রাম্প প্রশাসন

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি কি সাম্রাজ্যবাদ ফেরানোর ইঙ্গিত?

০৪:৫৩:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা, নাকি বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারের পুরনো সাম্রাজ্যবাদী ধারা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা—এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জোরালো হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ও ভাষণে স্পষ্ট হয়েছে, এটি নিছক বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়; বরং জোটকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বৈশ্বিক আধিপত্য জোরদারের কৌশল।

নতুন যুদ্ধ, পুরনো কৌশল

ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং দেশটির তেলসম্পদের ওপর দাবি তুলেছে, অন্যদিকে কিউবার ওপর অবরোধ জোরদার করেছে। কানাডা, গ্রিনল্যান্ড ও পানামা খাল নিয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক বক্তব্যও এসেছে হোয়াইট হাউস থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক সমাবেশ গড়ে তুলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে।

ট্রাম্প এই নীতিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বললেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিশ্ব থেকে সরে যাওয়া নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তিকে নতুনভাবে প্রয়োগ করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।

মিউনিখ ভাষণ ও সাম্রাজ্যের স্মৃতি

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভাষণ বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে। তিনি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক বিস্তারের ইতিহাসকে তুলে ধরে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পশ্চিমা শক্তি বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, কিন্তু পরে সেই প্রভাব কমে যায়। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনকে তিনি পশ্চিমা শক্তির পতনের কারণ হিসেবে আখ্যা দেন।

রুবিওর বক্তব্যে সাম্রাজ্যবাদী অতীতের প্রতি এক ধরনের গর্ব প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, মিত্রদের ‘দোষবোধে আবদ্ধ’ নয়, বরং নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত হওয়া উচিত। তার এই ভাষণ ইউরোপের কিছু ডানপন্থী মহলে প্রশংসা পেলেও বহু বিশ্লেষকের কাছে তা বিস্ময়কর মনে হয়েছে।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা

অনেক ইতিহাসবিদ ও নীতিবিশ্লেষক মনে করছেন, এই ধরনের ভাষা উপনিবেশ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো, যাদের জাতীয় পরিচয় গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, তারা এই অবস্থানকে উদ্বেগের চোখে দেখছে।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, আরব-ইসলামি বিশ্বে এই নীতির প্রভাব গুরুতর হতে পারে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের পুনরুত্থানের অভিযোগ তুলে নতুন সমর্থক টানার চেষ্টা করতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে পারে।

ঐতিহাসিক বাস্তবতা বনাম রাজনৈতিক ভাষণ

রুবিও তার বক্তব্যে ইউরোপীয় অভিবাসীদের আমেরিকা গঠনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করলেও, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নির্মম দমন-পীড়ন বা দাসপ্রথার ইতিহাসের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন। ইতিহাসবিদদের মতে, সাম্রাজ্যবাদকে শুধুমাত্র গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা বাস্তবতাকে আড়াল করে।

কিছু রক্ষণশীল ভাষ্যকার অবশ্য মনে করেন, রুবিও সাম্রাজ্যবাদ ফিরিয়ে আনতে চাননি; বরং পশ্চিমা সভ্যতার আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের কথা বলেছেন। তবে সমালোচকদের মতে, এই ‘সভ্যতাগত’ ভাষা আসলে বৈশ্বিক আধিপত্যের পুরনো ধারণাকেই নতুন মোড়কে উপস্থাপন করছে।

কোথায় যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি

বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্ব থেকে সরে আসছে না; বরং সামরিক প্রাধান্য পুনরুজ্জীবিত করছে। জোট ত্যাগ নয়, বরং সেগুলোকে চাপ প্রয়োগের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারই এখন কৌশল। এতে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ কি কেবল একটি স্লোগান, নাকি বিশ্বব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা? উত্তর যা-ই হোক, এর প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী হবে, তা এখনই স্পষ্ট।