০৭:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬
রফতানিতে বড় ধাক্কা: ফেব্রুয়ারিতে তৈরি পোশাকে পতন ১৩ শতাংশের বেশি, চাপে অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তৃত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি ট্রাম্প বললেন, ইরান যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে; নতুন শাসনব্যবস্থা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত ইরান সংঘাতে চাপে ভারতের ‘সবার বন্ধু’ নীতি ইংল্যান্ডকে হারাতে হলে ভারতকে নিজেদের ‘সেরা খেলা’ উপহার দিতেই হবে ইরানে টানা তৃতীয় দিনের হামলা: মধ্যপ্রাচ্যে জাদুঘর ও ঐতিহ্যকেন্দ্র বন্ধ যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম দুই দিন: পাঁচ বড় বার্তা জ্বালানি তেলের দামের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থাই আসল প্রশ্ন, ওপেক প্লাসের উৎপাদন বৃদ্ধি নয় ইরান যুদ্ধ ছড়াল লেবাননে, ৩ মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে কঠোর অবস্থানে ব্রিটেন-ফ্রান্স-জার্মানি

কিউবা সম্পত্তি মামলা নিয়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে শুনানি, ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বাড়তে পারে চাপ

কিউবায় ছয় দশক আগে বাজেয়াপ্ত হওয়া মার্কিন সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ নিয়ে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত এখন বিবেচনা করছে, কিউবার বিপ্লবের সময় কেড়ে নেওয়া সম্পদের জন্য মার্কিন কোম্পানিগুলো ক্ষতিপূরণ পাবে কি না। এই রায় শুধু আইনি লড়াই নয়, বরং ওয়াশিংটন ও হাভানার সম্পর্কেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ষাট বছরের পুরনো বিরোধ আবার আলোচনায়

১৯৬০ সালে ক্ষমতায় আসার পর ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সরকার কিউবায় থাকা প্রায় সব মার্কিন মালিকানাধীন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। এর মধ্যে ছিল হাভানা ডকস কোম্পানির বন্দর ব্যবসা। অস্ত্রের মুখে দখল নেওয়া সেই সম্পদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি আজও কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি।

দীর্ঘদিন বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়ে আটকে থাকলেও পরিস্থিতি বদলায় প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময়। একটি নীতিগত পরিবর্তনের ফলে কোম্পানিটি কিউবার বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো ও পর্যটক আনার অভিযোগে বড় বড় প্রমোদতরী কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ পায়। ২০১৬ সালে কিউবায় পর্যটন আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর প্রায় দশ লাখ পর্যটক হাভানায় গিয়েছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই

২০১৯ সালে দায়ের করা এই মামলা এবং বাজেয়াপ্ত তেল ও গ্যাস সম্পদের ক্ষতিপূরণ চেয়ে এক্সন মবিলের আরেকটি মামলা গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হয়। বিচারপতিরা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বিদেশনীতি নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন তোলেন।

শুনানিতে কয়েকজন বিচারপতি হাভানা ডকসের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব দেখান। বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট বাজেয়াপ্ত সম্পদকে কার্যত বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য নিষিদ্ধ বলে মন্তব্য করেন, যতক্ষণ না ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। বিচারপতি কেতনজি ব্রাউন জ্যাকসনও যুক্তিটিকে সরল ও স্পষ্ট বলে উল্লেখ করেন।

তবে দীর্ঘ শুনানির পরও আদালত কোন পথে রায় দেবে, তা স্পষ্ট হয়নি।

Supreme Court considers fate of docks and other assets seized by Cuba in  1960

ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আদালতে লিখিত বক্তব্যে জানায়, এই ধরনের মামলা কিউবায় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, এতে কিউবা সরকার বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে অর্থ আয় করতে পারবে না এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের ওপর চাপ বাড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, আদালত যদি কোম্পানিগুলোর পক্ষে রায় দেয়, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার ওপর আরও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে শক্তিশালী অবস্থানে যাবে। ইতিমধ্যে কিউবায় জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ এবং পর্যটন খাতে বিধিনিষেধ আরোপ করে চাপ বাড়ানো হয়েছে।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট

কিউবার বিপ্লবের আগে দ্বীপটির বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিফোন ব্যবস্থা, খনি শিল্প, আখক্ষেত ও তেল শোধনাগারের বড় অংশ মার্কিন কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিপ্লবের পর এসব সম্পদ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের হাতে যায়।

১৯৭১ সালে মার্কিন সরকারের অধীন ফরেন ক্লেইমস সেটেলমেন্ট কমিশন হাভানা ডকসের প্রায় ৯১ লাখ ডলারের দাবি স্বীকৃতি দেয়, যা মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ে বর্তমানে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের সমান। সব মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার দাবিদারের ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের দাবি স্বীকৃত হয়েছিল, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু অধিকাংশ দাবিই এখনও অনিষ্পন্ন।

১৯৯৬ সালে কিউবার যুদ্ধবিমান দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার পর যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করে। একই সময়ে হেলমস বার্টন আইন পাস হয়, যাতে বাজেয়াপ্ত সম্পদের ‘ব্যবহার বা লেনদেন’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে মামলা করার সুযোগ রাখা হয়। তবে বহু বছর ধরে প্রেসিডেন্টরা সেই বিধান স্থগিত রেখেছিলেন। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন তা কার্যকর করে, ফলে নতুন করে মামলার পথ খুলে যায়।

কিউবা যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাঁক

এই মামলার রায় কেবল ক্ষতিপূরণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এটি কিউবা যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কূটনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক চাপ এবং বিনিয়োগ ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রফতানিতে বড় ধাক্কা: ফেব্রুয়ারিতে তৈরি পোশাকে পতন ১৩ শতাংশের বেশি, চাপে অর্থনীতি

কিউবা সম্পত্তি মামলা নিয়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে শুনানি, ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বাড়তে পারে চাপ

০৫:০৭:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

কিউবায় ছয় দশক আগে বাজেয়াপ্ত হওয়া মার্কিন সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ নিয়ে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত এখন বিবেচনা করছে, কিউবার বিপ্লবের সময় কেড়ে নেওয়া সম্পদের জন্য মার্কিন কোম্পানিগুলো ক্ষতিপূরণ পাবে কি না। এই রায় শুধু আইনি লড়াই নয়, বরং ওয়াশিংটন ও হাভানার সম্পর্কেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ষাট বছরের পুরনো বিরোধ আবার আলোচনায়

১৯৬০ সালে ক্ষমতায় আসার পর ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সরকার কিউবায় থাকা প্রায় সব মার্কিন মালিকানাধীন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। এর মধ্যে ছিল হাভানা ডকস কোম্পানির বন্দর ব্যবসা। অস্ত্রের মুখে দখল নেওয়া সেই সম্পদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি আজও কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি।

দীর্ঘদিন বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়ে আটকে থাকলেও পরিস্থিতি বদলায় প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময়। একটি নীতিগত পরিবর্তনের ফলে কোম্পানিটি কিউবার বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো ও পর্যটক আনার অভিযোগে বড় বড় প্রমোদতরী কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ পায়। ২০১৬ সালে কিউবায় পর্যটন আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর প্রায় দশ লাখ পর্যটক হাভানায় গিয়েছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই

২০১৯ সালে দায়ের করা এই মামলা এবং বাজেয়াপ্ত তেল ও গ্যাস সম্পদের ক্ষতিপূরণ চেয়ে এক্সন মবিলের আরেকটি মামলা গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হয়। বিচারপতিরা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বিদেশনীতি নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন তোলেন।

শুনানিতে কয়েকজন বিচারপতি হাভানা ডকসের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব দেখান। বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট বাজেয়াপ্ত সম্পদকে কার্যত বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য নিষিদ্ধ বলে মন্তব্য করেন, যতক্ষণ না ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। বিচারপতি কেতনজি ব্রাউন জ্যাকসনও যুক্তিটিকে সরল ও স্পষ্ট বলে উল্লেখ করেন।

তবে দীর্ঘ শুনানির পরও আদালত কোন পথে রায় দেবে, তা স্পষ্ট হয়নি।

Supreme Court considers fate of docks and other assets seized by Cuba in  1960

ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আদালতে লিখিত বক্তব্যে জানায়, এই ধরনের মামলা কিউবায় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, এতে কিউবা সরকার বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে অর্থ আয় করতে পারবে না এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের ওপর চাপ বাড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, আদালত যদি কোম্পানিগুলোর পক্ষে রায় দেয়, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার ওপর আরও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে শক্তিশালী অবস্থানে যাবে। ইতিমধ্যে কিউবায় জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ এবং পর্যটন খাতে বিধিনিষেধ আরোপ করে চাপ বাড়ানো হয়েছে।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট

কিউবার বিপ্লবের আগে দ্বীপটির বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিফোন ব্যবস্থা, খনি শিল্প, আখক্ষেত ও তেল শোধনাগারের বড় অংশ মার্কিন কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিপ্লবের পর এসব সম্পদ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের হাতে যায়।

১৯৭১ সালে মার্কিন সরকারের অধীন ফরেন ক্লেইমস সেটেলমেন্ট কমিশন হাভানা ডকসের প্রায় ৯১ লাখ ডলারের দাবি স্বীকৃতি দেয়, যা মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ে বর্তমানে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের সমান। সব মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার দাবিদারের ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের দাবি স্বীকৃত হয়েছিল, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু অধিকাংশ দাবিই এখনও অনিষ্পন্ন।

১৯৯৬ সালে কিউবার যুদ্ধবিমান দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার পর যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করে। একই সময়ে হেলমস বার্টন আইন পাস হয়, যাতে বাজেয়াপ্ত সম্পদের ‘ব্যবহার বা লেনদেন’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে মামলা করার সুযোগ রাখা হয়। তবে বহু বছর ধরে প্রেসিডেন্টরা সেই বিধান স্থগিত রেখেছিলেন। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন তা কার্যকর করে, ফলে নতুন করে মামলার পথ খুলে যায়।

কিউবা যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাঁক

এই মামলার রায় কেবল ক্ষতিপূরণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এটি কিউবা যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কূটনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক চাপ এবং বিনিয়োগ ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।