ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চলতেই থাকবে—এমনই কঠোর বার্তা দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, সব লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান থামবে না। একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন, এই সংঘাতে আরও মার্কিন সেনার প্রাণহানির সম্ভাবনাও রয়েছে।
যুদ্ধের পক্ষে কঠোর অবস্থান
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত ইরান আমেরিকার জন্য অস্তিত্বগত হুমকি। তাই তিনি এই অভিযানকে ‘ন্যায়সঙ্গত মিশন’ হিসেবে তুলে ধরেন।
তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছিল বা দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে যাচ্ছিল—এমন কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বিশেষজ্ঞদেরও অনেকে মনে করেন, ইরান যদি সেই পথে এগোতও, বাস্তব সক্ষমতা অর্জনে আরও কয়েক বছর সময় লাগত।

নিহত সেনাদের প্রতি শোক, প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি
রোববার নিশ্চিত হওয়া তিন মার্কিন সেনার মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করা এই সৈন্যদের প্রতি জাতি ঋণী। তবে একই সঙ্গে জানান, সংঘাত চললে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে এবং যারা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে তাদের কঠোর জবাব দেবে।
কূটনীতির ইঙ্গিত, তবে ভাষণে নীরবতা
দিনের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, তারা কথা বলতে চাইলে তিনিও আলোচনায় রাজি।
ইরানে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এতে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি।

তবে রোববারের আনুষ্ঠানিক ভাষণে ট্রাম্প কূটনীতির প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি ইরানে শাসন পরিবর্তনের আহ্বান জানান। তিনি ইরানের বিপ্লবী গার্ড, সামরিক ও পুলিশ সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, তা না করলে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে।
অঞ্চলজুড়ে সংঘাতের বিস্তার
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের পাল্টা হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত ও পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত সেনারা কুয়েতে অবস্থান করছিলেন।
ইরান কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন ও ওমানেও হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০১ জন নিহত ও ৭৪৭ জন আহত হয়েছেন। ইসরাইলে নিহতের সংখ্যা অন্তত ৯, আহত ১২১ জন। কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকেও প্রাণহানির খবর মিলেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করেছে, তারা একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এতে কোনো ক্ষতি হয়নি।

সংঘাতের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নতুন নেতৃত্ব সরাসরি আলোচনার পথে না গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পথ বেছে নিতে পারে, যা রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, সামরিক কমান্ড কাঠামো আঘাতপ্রাপ্ত হলেও বাহিনীগুলো পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে। তিনি বলেন, নিজেদের জনগণকে রক্ষা করতে ইরানের জন্য কোনো সীমা নেই।
এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে। কূটনীতি ও যুদ্ধ—দুই পথই খোলা থাকলেও বাস্তবে কোনটি প্রাধান্য পাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















